emranorreja.com

এমরানুর রেজার কবিতা, গল্প, ভ্রমন, ভাষা বদল, মত-দ্বিমত, ছায়াছবি, বই রিভিউ, জলেশ্বরী, থিয়েটার ও আড়াইসিধা দিয়ে সাজানো…

Advertisement

ভুটানের টাইগার নেস্ট

বলতে গেলে ভুটানে আজই লাস্ট দিন। আজ বৃহস্পতিবার। কালকে শুক্রবার। কালকে সকালে আমাদের ফ্লাইট। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে গেলাম। উঠতে হলো। আজকে টাইগার নেস্ট যাচ্ছি। টাইগার নেস্ট প্রায় দশ হাজার ফিট উপরে। সকাল সকাল হাইকিং শুরু করা ভালো— ক্লান্তি কম লাগে। আমরা তিন জন— মোবারক ভাই, আরিফ আর আমি। আমাদের সাথে আমাদের গাইড তো আছেই। যেখানে গিয়েছি সেখানেই আমাদের সাথে গাইড ও গাড়ি ছিলো। বিষয়টি খুবই অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে আমার কাছে— মনে হচ্ছিল একটি অপ্রাসঙ্গিক ব্যাগ বয়ে বেড়াচ্ছি সাথে।

অন্ধকার নিভে যাওয়া আর আলো জ্বলে উঠার সময়টাতে আমরা টাইগার নেস্টের নিচে— নাস্তা সেরে নিয়েছি গাড়িতে বসেই। গাইড আমাদেরকে সমস্ত কিছু বুঝিয়ে দিলো— যাত্রা শুরু হলো। যাত্রা শুরু হওয়ার পাচ মিনিটের মধ্যে আরিফ এবং মোবারক ভাই স্টপ— তারা নাকি আর উঠতে পারবে না। আমি আগেই বলেছিলাম এই ধরনের ঝুঁকি নেয়ার দরকার নেই, তোমরা পারবা না— না, তারা আমার কথা শুনলেন না, শুনলো নিজের বাচ্চা মনের কথা। এইবার বসে থাকো ছয় ঘন্টা গাড়িতে— বসে বসে বাদাম খাও— কত ভালো ছিলো পারোর হোটেলে অবস্থান করে আস্তে ধীরে গ্রাম দেখতে বের হলে— কে শুনে কার কথা— বলের আগে ঢুকে মাথা।

উপরে উঠছি আর মাথা ভার হয়ে আসতেছে। তবু উঠছি। পুরাতন পুরাতন গাছের সাথে দেখা হচ্ছে। একটি গাছের বয়স একশো বছর, কোনো গাছের বয়স দেড়শো বছর— এমন গাছও দেখতে পেয়েছি যার বয়স দুইশো বছর— বাপরে বাপ, আমার দাদার বাপের সমান বয়সী একটি গাছ— আমার দাদা নাই, দাদার বাপ তো আরও আগে নাই অথচ এই গাছ এখনো আছে শক্তিশালী অবয়বে— গাছটির একটিও দাত পড়েনি বরং নতুন দাত গজিয়েছে যেনো।

গাছ পৃথিবীর এক বিস্ময়— প্লানেটের অন্যকোথাও গাছের থাকা বিষয়টা অস্বাভাবিক ব্যাপার— গাছ পৃথিবীর একেবারে নিজস্ব ব্যাপার এখন পর্যন্ত— মানুষ এবং আমি মনে করি।

টাইগার নেস্টও একেবারে বিস্ময়কর একটা ব্যাপার— পাহাড়ের কানের কাছে একটা সুন্দর গোছানো বাসা— মানুষের তৈরি বাসা— যদিও ভুটান মনে করে এটি নির্মাণ করেছেন মহান এক দেবতা যিনি ডেমনদের সাবডিও করেছেন এবং এই এলাকায় শিষ্টের পালন নিশ্চিত করেছেন। কিংবদন্তি না থাকলে মানুষের গল্পশোনা মন শান্ত হতে চায়না— কিংবদন্তি মনে করে, ভুটানের টাইগার নেস্ট শুধু একটি পাহাড়চূড়ার মঠ নয়, এটি একটি জীবন্ত কিংবদন্তি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, অষ্টম শতাব্দীতে গুরু রিনপোছে (পদ্মসম্ভব) এক বাঘিনীর পিঠে চড়ে এই খাড়া পাহাড়ের গুহায় এসে অবতরণ করেন। তিনি সেখানে তিন বছর, তিন মাস, তিন সপ্তাহ, তিন দিন ও তিন ঘণ্টা ধ্যান করেন। সেই ধ্যানের মাধ্যমে অশুভ শক্তিকে পরাস্ত করে স্থানটিকে পবিত্র করেন। এরপর থেকেই এর নাম হয় তাকসাং— অর্থাৎ বাঘিনীর আস্তানা (Tiger’s Nest)।

আজও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,১২০ মিটার উচ্চতায়, খাড়া পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই মঠ যেন মনে করিয়ে দেয়— কিছু শিখরে পৌঁছাতে শক্তির চেয়ে বিশ্বাস, আর পায়ের চেয়ে হৃদয়ের প্রয়োজন বেশি।

টাইগার নেস্টের দিকে যাচ্ছি আর দেখছি প্রকৃতির হৃদয়খোলা সৌন্দর্য— ক্লান্তি আসছে শরীরে, আবার চলেও যাচ্ছে। বহু মানুষের সাথে দেখা হচ্ছে।

এক পরিবার সাথে দেখা হলো— বাঙালি পরিবার, আদির বাবা-মা। একপর্যায়ে আদির বাবার উঠতে কষ্ট হচ্ছিল— মনে হচ্ছিল আর তিনি উঠতে পারবেন না। আমি তার হাতটা ধরলাম। কিছুক্ষণ আকোচিকিৎসা দিলাম— নিচ দিয়ে পোত পোত করে তার বাতাস বের হতে লাগলো। বললাম, বের হতে দিন— বাতাস যত বের হয়ে যাবে আপনার ফুসফুস তত চাঙা হয়ে উঠবে। বাহ, বারে, কিছুক্ষণ পর আদির বাবা সম্পূর্ণ সুস্থ এবং চলছে টাইগার নেস্টের দিকে। বললাম, দাদা, আরামসে হাটেন, কোনো সমস্যা হলে আছি আপনার সাথে আমি— প্রয়োজনে কাধে করে আপনাকে নিয়ে উঠে যাবো টাইগার নেস্টের চূড়ায়, ডোন্ট ওরি। দাদা আমার কথাতে বেশ আশ্বস্ত হলো।

অর্ধেক পথ উঠার পর সুন্দর একখান কফিশপ পেলাম— ডাবল শট এস্প্রেসো খেতে খেতে দেখছি টাইগার নেস্ট কত সুন্দর অনুপম উপায়ে মেঘের ঘোমটা পড়ে আছে—ঘোমটাপরা টাইগার নেস্ট দেখছি এমন সময় দেখি আমার পাশে বসা এক সুন্দর আত্মা বলছে— হ্যালো। আমিও বললাম— হ্যালো। তারপর শুরু হলো কথা।

তিনি দ্রাবিড় রাজ্য কন্যা— স্কুলে ইংরেজি শিক্ষা দিতেন— এখন অবসরে আছেন— তিনার নায়ক টাইগার নেস্ট ধরতে গেছেন— তিনি যেতে পারেনি— তিনি বসে আছেন তিনার নায়কের জন্যে। মাধ্যমিকের প্রধান শিক্ষক ছিলেন এবং এখন অবসরে আছেন তিনি। কেরালার এই দ্রাবিড় নিষাদ ম্যাডামের সাথে গল্প করে ভালো লাগলো— খুবই আন্তরিক মানুষ।

এইবার আমি আবারও আন্তরিক পদক্ষেপে যেতে লাগলাম আরও উপরে মধ্যাকর্ষণের ক্ষমতা ভেদ করে। বেশ ভালো লাগছে আমার— শরীরের কোষে কোষে আনন্দনৃত্য বয়ে যাচ্ছে— সবই এস্প্রেসোর ক্ষমতা— সুন্দরকে আরও সুন্দরভাবে দেখাতে সহায়তা করে।

বিচিত্র গাছপালা যেমন দর্শন হচ্ছে তেমনি দেখা পাচ্ছি বিচিত্র মানুষের— সবাই প্রায় ইন্ডিয়ার— কয়েকজন সাদা চামড়ার মানুষকে দেখি— এখানে সবই যেনো নিষাদ মেলা। উড়িষ্যার এক স্কুল শিক্ষিকার দেখা পেলাম— মাধ্যমিকে বিজ্ঞান পরায়— সে আমার কাছে জানতে চায়লো আমি কনটেন্ট ক্রিয়েটর কিনা— আমি বললাম, আমি কনটেন্ট ভিউটর। আমার কথা শুনে সুন্দরী ম্যাডাম দিলো এক গালভারী হাসি— সুন্দরী ম্যাডামের হাসিতে প্রকৃতি যেনো আরও রূপময় হয়ে উঠলো— আরও শক্তিময় হয়ে উঠলাম আমি— শক্তিময় আমি ক্লান্তিময় সময়ের কথা ভুলে গিয়ে ছুটে চললাম সুন্দরী টাইগার নেস্টের দিকে— থেকে থেকে বড় হচ্ছে আনন্দের ডাক— দিকে দিকে ডেকে যাচ্ছে রূপের বাহার।

বড় পর্দায় আমরা যেমন দৃশ্য দেখি এবং যে দৃশ্য দেখে আমরা মুগ্ধ হই— তারচেয়ে সুন্দর দৃশ্য চোখের সামনে— এই পাহাড়গুলো বলতে গেলে পাথরের পাহাড় কিন্তু তারও উপরে জন্ম নিচ্ছে এই পৃথিবীর বিরাট অবদান— গাছ বৃক্ষ লতা। যে রাস্তা দিয়ে টাইগার নেস্টের দিকে যাচ্ছি সে রাস্তাটি না আধুনিক না সনাতন— এই রাস্তার মতোই ভুটান তার প্যান মানসিক আচরণ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে— গ্রোজ হ্যাপিনেসের দিকে।

একজন ইন্ডিয়ান ডাক্তারের সাথে দেখা হলো— বেঙালোরের ডাক্তার। তিনি আমার কাছে শেখ হাসিনা জ্বি সম্পর্কে জানতে চায়লো। আমি বললাম শেখ হাসিনা জ্বি তো ইন্ডিয়াতে আছেন— আমার চেয়ে আপনার ভালো জানার কথা। টাইগার নেস্টে উঠতে নামতে অনেক টুরিস্টের সাথে কথা হলো— মজার ব্যাপার হলো, সবাই আমাকে দ্রাবিড় রাজ্যের লোক ভেবেছে এবং যখন জেনেছে আমার জন্মস্থান বাংলাদেশ তখনই জানতে চেয়েছে শেখ হাসিনা জ্বি সম্পর্কে।

আমাকে যদি বলেন টাইগার নেস্টে উঠা এবং নামার সবচেয়ে সুন্দর উপায় কি বলেন তো— আমি বলবো— আস্তে আস্তে ধীরে ধীরে। এমন একটা টিম যারা গান গায়বে, নাচ করবে, আবৃত্তি করবে, ধ্যান করবে— তাড়াহুড়োবিহীন চলনশীল একটি টিমবাহন যারা আস্তে আস্তে এগিয়ে যাবে গন্তব্যের দিকে— তারাই উপভোগ করতে পারবে এমন সৌন্দর্যের টিপটাপ ঘরসংসার এবং তারাই মায়াবনবিহারিনী।

উঠতে উঠতে একটি গাছের দিকে আমার দৃষ্টি আটকে যায়— গাছের নাম জানি না— ফুলকপির মতো ছাতাময়— তার প্রতিটি অঙ্গ থেকে বের হচ্ছে এক ছায়াময় আভা যা চোখকে সৌন্দর্যের সাবানে নীরবতার আহবানে শীতলতার গভীরতায় ধৌত করে নিচ্ছে পবিত্র করে নিচ্ছে জাস্ট— ঠিক সেই মুহূর্তে ফিল করতে থাকি জীবনের জন্ম এখানে হলো আমার— মৃত্যু হলো এখানেই— কে বলে মানুষ একবার জন্মে!?

এগিয়ে যাচ্ছি টাইগার নেস্টের দিকে— যে পথ দিয়ে যাচ্ছি তার পাশেই একটি পানির পাইপ— পাইপের পাশে লেখা ‘হোলি ওয়াডার’— পবিত্র পানি— পবিত্র পানি পান করে পবিত্র হয়ে নিলাম। এইবার তিনশো সিড়ি নিচে নামতে হবে— চারশো সিড়ি উপরে উঠতে হবে। শুরু করলাম নামা— নামছি আর দেখছি ঝর্না— পাহাড়ের মাথা থেকে নেমে আসা ঝর্না। এই ঝর্না নিয়েও ভুটানের কাছে জমা আছে কিংবদন্তী। ভুটান মানে হাজার হাজার কিংবদন্তী। পার্কে গেলে কিংবদন্তী— জাদুঘরে গেলে কিংবদন্তী— নদীতে গেলে কিংবদন্তী— ফসলে গেলে কিংবদন্তী— খাবারে গেলে কিংবদন্তী— বাজারে গেলে কিংবদন্তী। কিংবদন্তী আর কিংবদন্তী। জনাব গাইড কান জ্বালাপালা করে ফেলে কিংবদন্তী অর্ফে কিসসা বলতে বলতে।

একটা ভুলবোঝাবুঝির কারনে জনাব গাইড আমার সাথে নাই — উঠার সময়— বাচা গেলো— নতুবা গাছ নিয়ে কতধরনের কিংবদন্তী যে শুনা লাগতো আল্লা মালুম। ঝর্না দেখে আরও শান্তিতে চলে গেলাম— যেনো শান্তির সমাধিতে আছি। এইবার সিড়ি উঠার পালা। উঠলাম— এখন জনাব গাইডকে লাগবে। টিকেট সংগ্রহের ব্যাপার স্যাপার আছে— গাইড মাস্ট জাতীয় ব্যাপার স্যাপার। হৃদয় শান্তিতে শীতল হয়ে আছে— এখন টাইগার নেস্টের ভেতরে যাবো— শুরু হলো কিংবদন্তীর বর্ননামেলা— প্রথমে একটা পাথরের থাম্ব দিতে হবে— এটি ওয়িশ পাথর— দশ ফুট দূর থেকে মনে মনে একটি ওয়িশ করে চোখ বন্ধ করে সেই শোয়ানো পাথরের থাম্বের মতো গোলাকার অংশে থাম্ব রাখতে হয়— রাখতে পারলে আশা পূর্ণ হয়— আমি রাখতে পেরেছি— অবাক হয়েছি— কারন থাম্ব রাখার কাজটি অনেক কঠিন— অনেক মানে অনেক। তারপর একে একে মোট সাতটি কক্ষে যাওয়া হলো—ধ্যান করা হলো— হলো প্রার্থনা করা। সাতটি কক্ষে ভ্রমণ শেষে যখন নিচে নেমে যাবো ঠিক তখন গাইড বললো টাইগার নেস্টের মূল জায়গায় যাওয়ার জন্যে যেখানে টাইগার থাকতো। আমি টাইগার দেখার জন্যে চিকন এক গুহারাস্তায় গেলাম— সেখান থেকে মই দিয়ে আরও নিচে নামলাম— আমার সাথে আছে দ্রাবিড় রাজ্যের এক অসাধারণ কিশোর ছেলে—কিগান— খুবই অমায়িক এক ছেলে। টাইগার কোথায়? খুব চিকন এক গুহার ভেতরপ্রান্তে আলো জ্বলছে— এই আলোই হয়তো টাইগার।

আলোর সামনে এই গুহার ভেতরে ধ্যান করলাম কিছুক্ষণ— বুঝতে পারলাম শারীরিক শুন্যতায় বসবাস করার জন্যে প্রাকৃতিক শূন্যতা দরকার আছে। এই কারনে হয়তো

হযরত মুহাম্মদ (ﷺ ) মক্কার জাবাল আন-নূর পাহাড়ে অবস্থিত হেরা গুহায় নির্জনে ইবাদত ও ধ্যানে (তাহান্নুছ) মগ্ন হতেন। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে গুহাটির উচ্চতা প্রায় ২৭০ মিটার বা ৮৮৬ ফুট। অর্থাৎ, তাঁকে প্রায় ৮৮৬ ফুট উঁচুতে উঠে সেখানে পৌঁছাতে হতো— এটি আজকের মতো সহজ পথ ছিল না— তখন কোনো পাকা সিঁড়ি বা পর্যটন-সুবিধা ছিল না— খাড়া ও পাথুরে পাহাড়ি পথ বেয়ে তাঁকে উপরে উঠতে হতো।

ইচ্ছা করলাম এই টাইগার নেস্টে সারারাত থাকবো। সারারাত ধ্যান করে ঘুম করে মৌনতা যাপন করে সকালের আলো মাখতে মাখতে নিচে নামবো। দয়াল ভরসা। দয়াল কবুল করলে সবই হবে। নেমে যাচ্ছি নিচে। সীতাকুণ্ড আর টাইগার নেস্টের মধ্যে একটি সাদৃশ্য আছে— বৈসাদৃশ্য কেবল উঠানামার ব্যবস্থাপনায়— ভুটানের ব্যবস্থা সুন্দর— বাংলাদেশের সীতাকুণ্ডের ব্যবস্থাপনা বিশৃঙ্খল। টাইগার নেস্টে উঠতে নামতে রাস্তাগত জায়গা থেকে কোনো রিস্ক কাজ করে না কিন্তু সীতাকুণ্ডে ঝুকিপূর্ণ উঠানামা। নামতে নামতে কিগানের সাথে পরিচয় হলো, পরিচয় হলো কিগানের মায়ের সাথে— ছেলের মতো মাও দারুণ স্মার্ট— মে বি তিনি সিঙ্গেল মাদার— ইন্ডিয়াতে যদিও সিঙ্গেল মাদারের আইডিয়াটা ঠিক এখনো জমে উঠেনি— তবে জমে উঠবে।

আমি সিঙ্গেল সিঙ্গেল মনোভাবে নেমে যাচ্ছি পাহাড় থেকে ভূমির দিকে— প্রকৃতির রূপরাজি দেখে দেখে মুগ্ধ হচ্ছে আমার দেহতনুমন।

নামার সময় আবার ক্যাফেতে যাই— এক কাপ চা খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে আবারও দেখি অবসরের পাহাড়। এই পাহাড়ে কিন্তু পাখিটাহি সেই অর্থে আমার চোখে পরেনি— চোখে পরেনি সেই অর্থে কোনো প্রানী। নিচে নামছি আর রোদ উপরে উঠছে। রোদের আধিপত্য তেমন নেই— প্রকৃতি আর শীতের আধিপত্য এখানে অবিরাম অবিচল।

এক গল্পবাজ বাবা অথবা কথাপ্রিয় বাবা নিচে নামছে আর ভুটানের সরকার ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলছে— তার মতে ভুটানের রাজা এবং ভারতের প্রেসিডেন্ট একই ক্যাটাগরির। তার কথা শুনছে তার দুই কন্যা আর তাদের সুবোধ গাইড। আমিও যুক্ত হলাম তার সাথে কথায়। সে সহজে আমাকে তার গল্পের জগতে স্বাগতম করে নিলো।

ভালো একজন শ্রোতা এবং উত্তম প্রশ্নকারী পেয়ে তিনি বিশাল খুশি— তার মেয়েরাও খুশি— মুখে তাদের মিটমিট হাসি— বিষয়টা এমন: এতোক্ষনে তাদের বাবা একজন যোগ্য সঙ্গী পেলো।

সুন্দরী মেয়েদের খুশি দেখে যেকোনো সুন্দর মনের মানুষের খুশিও হওয়া খুবই স্বাভাবিক— আমিও খুশি— ডোপামিন হরমোন দারুণভাবে রিলিজ হচ্ছে— গল্পবাজ কাকু নানা বিষয় নিয়ে কথা বলছেন— তিনার বাড়ি তালিমনাড়ু— এইবার শুরু করলেন বাংলাদেশ নিয়ে— বাংলাদেশের আন্দোলন কি দারুণভাবে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে কতিপয় সুবিধাবাজ অসাধু ব্যক্তি তাই নিয়ে কথা বললেন— বাংলাদেশের আরও আরও বদনাম করলেন গল্পবাজ কাকু— বদনাম করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন তিনি— তিনার হাটার গতিও মন্তর হয়ে আসছে। বুঝতে পারলাম বদনাম করলে আয়ু কমে শক্তি কমে। আমার আবার একটু দ্রুত যেতে হবে। বললাম— if you Don’t mind uncle, I want to walk so fast and wish to walk forward. তিনি বললেন— No problem, okay — Let me know where is your state? আমি জবাব দিলাম uncle, my country name is Bangladesh. তারপর এক বিশাল টাইপের হাসিতে ভরে উঠলো পাহাড়ের প্রকৃতি। তিনার দুই কন্যার হাসি যেনো থামতেই চাচ্ছে না। আমিও হাসতে হাসতে নিচে নামি। এক ঢিল দূরত্বে যাওয়ার পর দুই কন্যা তার বাবাকে বলতেছে—

অরে ইয়ার, তুম তো বুরি তরহ ফাঁস গয়ে! বাংলাদেশ কে লোগোঁ কে সামনে হি বাংলাদেশ কি কমিয়াঁ গিনা রহে হো।

তাদের বাবা উত্তর দিলো— “তো কিয়া হুয়া, গালতি তো গালতি হ্যায়।”

কান তাদের কথা শুনে ফেলে— মুখও উত্তর দিয়ে ফেলে—

আঙ্কেল, আপ সহি কহ রহে হ্যাঁ। গালতি তো গালতি হ্যায়। ফির মিলেঙ্গে। মেরি তরফ সে আপকো অউর আপকি পুরি ফ্যামিলি কো বহুত বহুত দুআয়েঁ।”

আরেকটু নিচে নামার পর দেখি নবজাতকের চোখের মতো স্বচ্ছ জল ঢল ঢল করে নামছে। কাপড় থাকলে নিশ্চিত এখানে জলডোব দিতাম তো দিতাম। খুব ভালো করে জলসঙ্গ করে নিলাম— সারা শরীর যেনো নতুন হয়ে গেলো। নতুন শরীর নিয়ে গাড়ির কাছে গেলাম। আমার জন্যে অপেক্ষা করছে তারা। মোবারক ভাই ক্যাফে পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল বিভিন্ন জনের সাথে গল্প করতে করতে কচ্চপ গতিতে— ক্যাফে থেকে আস্তে আস্তে গল্প করতে করতে টাইগার নেস্টের কাছে চলে গিয়েছিল কিন্তু তারপরে আর যেতে পারিনি— কারন তারপর যেতে গাইড লাগে। আর আমগো গাইড তো আর গাইড না— বলতে গেলে ভুটানের রাজার পুলা— ভুল করে এই পেশায় যেনো এসেছে সে— যাকগে, মোবারক ভাইকে অভিনন্দন এবং অভিনন্দন আমাকে। কারন অনেকে মনে করে টাইগার নেস্ট হাইক করা আসলে একটি অর্জন। তবে টাইগার নেস্ট উঠার সময় এবং নামার সময় একটি কবিতা বারবার বলতেছিলাম— তামান্না এক খুবসুরত এহসাস হ্যায়, যো দিল মে রেহতা হ্যায় ঔর আঁখোঁ সে জগমগাতা হ্যায়।

আহারে স্বপ্ন! তারা বলে মানুষ স্বপ্নে বাচে— আমি বলি— স্বপ্ন আমার মধ্যে বাচে।