emranorreja.com

এমরানুর রেজার কবিতা, গল্প, ভ্রমন, ভাষা বদল, মত-দ্বিমত, ছায়াছবি, বই রিভিউ, জলেশ্বরী, থিয়েটার ও আড়াইসিধা দিয়ে সাজানো…

Advertisement

জঙ্গল বিচ এন্ড সিনিমন আইল্যান্ড

বিড়াল বিষাক্ত কিছু ভক্ষণ করলে সে আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে এবং তেলজাতীয় পদার্থ লেহন করতে থাকে। এতে তার বিষক্রিয়া চলে যায়। সাপ যখন গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে, তখন সে চোখে কিছু দেখতে পায় না। এমতাবস্থায় মৌরির পাতার সাথে চোখ ঘষতে থাকে এবং এতে একসময় সেই সাপটি আপন দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায়। তেমনিভাবে চিকিৎসক দেখলেন, ‘কোষ্ঠ-কাঠিন্য’ হলে পাখি সমুদ্রে চুমুক দিয়ে পানি পান করে। আর আমি দেখেছি। দেখেছি বলতে বিষয়টি গভীরভাবে অবজার্ভ করেছি, আমাদের মোবারক ভাই যখন বোরখাপরিত কোনো মহিলা মানুষ অথবা মেয়ে মানুষ দেখে, সাথে সাথে তার মেজাজ বিষাক্ত হয়ে যায়। মোবারক ভাই তখন বিষমুক্ত হওয়ার জন্যে রুমে গিয়ে গান শুনে অথবা একটা উদার ওপেন প্লেসে চলে যায়।

আজকে আমরা যাচ্ছি শ্রীলঙ্কার দারুণ এক ওপেন প্লেসে— প্লেসটি উদারও বটে। গলে ফোর্ট থেকে টুটু করে যাত্রা শুরু করেছি আমরা। হাবিব, রুবেল ভাই, আমি আর মোবারক ভাই। আমরা প্রথমে গেলাম সিনিমন আইল্যান্ডের দিকে। বোট ভাড়া করে সিনিমন আইল্যান্ডের জলএলাকা দেখে নিলাম। জলএলাকাটি রাতার গুলের মতো। তবে বিখ্যাত গাছপালা দিয়ে ঘেরাফেরা না— বিচিত্র প্রানী দেখা যায়। যা পাখি দেখলাম তা সবই অতিথি পাখির মতো। আমরাই যেখানে অতিথি সেখানে পাখিকে তো অনিত্য অতিথি মনে হওয়ার কোনো অযথা কারণ নেই। কুমিরের মতো দেখতে একটি প্রাণীকে দেখলাম জলএলাকায়— ঘুমাচ্ছে সে। কুমিরের ঘুম সুন্দর। সুন্দর কুমিরের জেগে উঠার দৃশ্য। ঘুম থেকে জেগে উঠে কুমির সুস্থ নির্মল বাচ্চার মতো— প্রথমে চোখ মেলে, তারপর মাথা তুলে, তারপর সমগ্র শরীর। কুমিরের চোখ মেলার দৃশ্যটি খুবই সুন্দর।

শ্রীলঙ্কার Cinnamon Island–এ পৌঁছে আমাদের সামনে এক তরুণ দাঁড়াল— উদাম শরীর, সরল চেহারা। পড়াশোনা নাকি তেমন বেশি নয়, কিন্তু ইংরেজি বলে অবলীলায়। মনে হলো যেন সেই প্রবাদটির জীবন্ত উদাহরণ—“গাইতে গাইতে গায়েন।” অভিজ্ঞতা আর চর্চাই তাকে দক্ষ করে তুলেছে। সে আমাদের দারুচিনি বা cinnamon সম্পর্কে ব্যাখ্যা করছিল। আমরা শুনছিলাম মুগ্ধ হয়ে—রাশিয়ার কয়েকজন, ফ্রান্সের কয়েকজন, আর আমরা বাংলাদেশের কয়েকজন। তার কথায় ছিল নদীর মতো শান্ত ছন্দ, আবার ছিল এক অদ্ভুত আকর্ষণ। মার্কেটিংয়ের এমন কৌশল— নীরব, কোমল, অথচ কার্যকর। শেষে দেখা গেল আমরা প্রায় সবাই দারুচিনির নানা পণ্য কিনে ফেলেছি।

সেখানেই প্রথমবার কাছ থেকে দেখলাম দারুচিনি গাছ, আর দেখলাম কীভাবে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে গাছের ছাল থেকে দারুচিনি ও তার তেল প্রস্তুত করা হয়। দারুচিনি চাও খেয়েছি। স্বাদে খুব মধুর নয়, কিন্তু গুণে অনন্য। পৃথিবীর অধিকাংশ ঔষধি জিনিসই এমন—স্বাদে নয়, গুণেই তাদের মহিমা। অবশ্য মধুর কথা আলাদা।

দ্বীপটি ছোট। শুনলাম পুরো Cinnamon Island–এ মাত্র একটি পরিবার থাকে। তাদের ঘরবাড়ি খুবই সাদামাটা, কিন্তু পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন। আশপাশের পরিবেশটাও নির্মল। এমন পরিবেশ দেখলে মোবারক ভাইয়ের মন ভালো হয়ে যায়—তিনি সবসময় বলেন, “জীবন এমনই হওয়া উচিত— সরল আর পরিচ্ছন্ন।”

নৌকায় করে আমরা ঘুরছিলাম Madu River–এর জলে। জলের মধ্যে যেন এক নীরব আহ্বান আছে—শান্ত, ধীর, মুগ্ধকর। নদীর দুই পাশে বেশ কয়েকটি রিসোর্ট চোখে পড়ল। মনে হলো, এখানে যদি এক–দু’দিন থাকা যেত! সমস্যা নেই—কোনো একদিন হয়তো থাকা হবে।

শুনলাম এই জলাভূমি এলাকায় ভিন্ন ধরনের বানর আর অদ্ভুত কিছু পাখি দেখা যায়। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের চোখে পড়েনি।

দ্বীপে যাওয়ার আগে যেখানে আমরা বোট রেখেছিলাম, সেখানে আরেকটি মজার অভিজ্ঞতা হলো। পানিতে ঘেরা একটি জায়গায় রাখা ছিল ছোট ছোট মাছ—যাদের অনেকেই fish spa–র মাছ বলে চেনে। পা পানিতে দিলেই মাছগুলো দৌড়ে এসে পায়ের চামড়া খেতে শুরু করে। দারুণ সুরসুরি লাগে— একেবারে প্রাকৃতিক পেডিকিউর! ডিসকাউন্ট রেটে সুযোগ পেয়ে আমরা সবাই সেই অভিজ্ঞতা নিলাম। মাছের সুরসুরি পেয়ে রুবেল ভাই এমন শব্দ করছিলেন যে মনে হচ্ছিল তিনি যেন অদ্ভুত এক আনন্দে ডুবে গেছেন। মোবারক ভাইয়ের ভালো লাগছিল ঠিকই, কিন্তু তেমন প্রতিক্রিয়া নেই— হয়তো সেন্সর একটু পুরোনো হয়ে গেছে! আর হাবিবের কথা না–ই বা বললাম— সে তো রুবেল ভাইকেও ছাড়িয়ে গেছে। নতুন বিয়ে করেছে কয়েকদিন হলো— উচ্ছ্বাস থাকবেই।

Koggala Lake–এর বোট সাফারির প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে ছিল একটি সাইনবোর্ডটি। বোর্ডে লেকের জল, ছোট দ্বীপ, বানর, পাখি, কুমির, আর মানুষের নৌভ্রমণের ছবি—সব যেন একসাথে একটি গল্প বলছিল। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি নিজেই পর্যটকদের আহ্বান জানাচ্ছে—এসো, আমার নীরব রাজ্যে প্রবেশ করো। প্রবেশ করে আমাদের লস হয়নি— পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক লাভে পরিপূর্ণ সময় প্রবাহিত হয় আমাদের ভালোলাগা রক্তের ভেতর।

কুমিরকে যতবার দেখেছি ততবার মনে হয়েছে সে এক ব্যথাতুর প্রাসাদ। কুমিরকে কখনো হাসতে দেখিনি। আনন্দে নেচে উঠতে দেখিনি তার সমগ্র শরীর। কুমির যেন একাই পেন্ডুরার বক্স গিলে খেয়েছিল— সে যেন বিষন্ন জীবনানন্দ দাশ— সে যেনো বিপন্ন বিস্ময় থেকে বেড় হতে পারছে না কোন মতে। Koggala Lake-এ ঢুকেই বড় গুইসাপটি ((Monitor Lizard) দেখে কুমিরের কথা মনে এসে গেল। ভাবলাম, তার সাথে বসে কফি খেতে খেতে আড্ডা দিতে পারলে ভালোই হতো। কিন্তু কুমির কি আমাকে মাংস না ভেবে আড্ডাবন্ধু ভাবতে পারে? আমাকে সে বন্ধু ভাবতে পারলেই জানতে পারতাম কোথা থেকে তার এতো দুঃখ আসে। আহারে! Koggala লেকে ঘুরতে ঘুরতে কতো কথা ভেসে আসে মনে, কতো কথা মেঘ হয়ে উড়ে যায়। সব মিলিয়ে চোখের সামনের বর্তমানে চাষ করি আয়োজন, আমার চাষকৃত আয়োজন চাষ করে প্রয়োজন। সব মিলিয়ে Cinnamon Island ভ্রমণটা ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা— দারুচিনির গন্ধ, নদীর নীরবতা, মানুষের সরল জীবন আর কিছু হাস্যরস মেশানো স্মৃতি।

শ্রীলঙ্কার Cinnamon Island–এ যাওয়ার আগে আমরা কয়েকটি কচ্ছপের খামার পরিদর্শন করি। আসলে এগুলো সাধারণ খামার নয়—বরং সমুদ্রের কচ্ছপ সংরক্ষণের ছোট ছোট কেন্দ্র। শ্রীলঙ্কার উপকূলে বহু বছর ধরে কচ্ছপের ডিম মানুষ সংগ্রহ করে খেয়ে ফেলত কিংবা বিক্রি করত। ফলে কচ্ছপের সংখ্যা দ্রুত কমে যেতে থাকে। সেই সংকট থেকেই স্থানীয় মানুষ ও কিছু পরিবেশবাদী সংগঠন এই হ্যাচারি বা সংরক্ষণকেন্দ্রগুলো গড়ে তুলেছে।

এখানে সমুদ্রতট থেকে কচ্ছপের ডিম সংগ্রহ করে নিরাপদ বালুর মধ্যে রাখা হয়। নির্দিষ্ট সময় পরে সেই ডিম থেকে ছোট ছোট কচ্ছপ বের হয়। কয়েকদিন যত্নে রাখার পর তাদের আবার সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়া হয়— যেন তারা প্রকৃতির নিজের চক্রে ফিরে যেতে পারে।

খামারে আমরা নানা ধরনের কচ্ছপ দেখলাম— কারও খোলস কালচে, কারও আবার সবুজাভ। কিছু ছিল অতি ছোট, হাতের তালুতে ধরার মতো; আবার কিছু বিশাল, বয়সে বহু বছরের সাক্ষী। জানা গেল, আহত বা জেলে জালে আটকে পড়া কচ্ছপগুলোকে এখানে চিকিৎসাও দেওয়া হয়। আমার চোখ তো কপালে উঠে যায় যখন শুনি কচ্ছপ প্লাস্টিক খেয়ে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। তারপর এই হ্যাচারিতে এনে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। কচ্ছপ খাবারের ব্যাপারে খুবই চোজি। কিন্তু প্লাস্টিক পৃথিবীর হাত থেকে কচ্ছপও রেহাই পাচ্ছে না!? মানুষের ব্রেইনে অনেক আগে থেকে প্লাস্টিক পার্টিকেল ঢুকে যাচ্ছে। ফলে মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। মানুষ চিন্তা করে প্লাস্টিক বানিয়েছে— তা-ই এখন মানুষের ক্ষতির কারন— চিন্তা ক্ষমতা যেহেতু কমে যাচ্ছে— এখন যা বানাবে তা যে কি হবে ভাবতেই চোখ আসমানের দিকে যাচ্ছে বারবার— উপায় নাই চান্দু উপায় নাই!

সবচেয়ে মজার দৃশ্য ছিল ছোট কচ্ছপগুলোকে পানির ছোট ট্যাংকে সাঁতার কাটতে দেখা। তারা যেন সমুদ্রের ভবিষ্যৎ নাগরিক— ছোট ছোট পাখনার ঝাপটায় নিজেদের পৃথিবী খুঁজে নিতে শিখছে।

এই সংরক্ষণকেন্দ্রগুলো দেখে মনে হলো—মানুষ যখন চায়, তখন প্রকৃতির ধ্বংসের কারণ না হয়ে তার রক্ষকও হতে পারে।

ডলার খরচ করে এই কচ্ছপগুলো দেখতে দেখতে— কচ্ছপের খামারে দাঁড়িয়ে— হঠাৎ মনে পড়ে গেল এক সাধুত্মার কাহিনি।

বয়স তখন খুব বেশি নয়— দশ কি বারো। সেই কোমল বয়সেই তিনি এক গুরুর দরজায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। প্রায় দুই বছর তিনি নীরবে, নিবেদিত প্রাণের মতো গুরুর সেবা করে গেলেন। সময় যেন সেখানে অন্য ছন্দে বয়ে যাচ্ছিল—দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, সেবার ভেতর দিয়েই তিনি শিখছিলেন নীরবতার ভাষা।

একদিন হঠাৎ গুরু তাকে ডেকে বললেন, “আমার কাছে তোর দায়িত্ব শেষ। এবার তুই জঙ্গলে চলে যা।”

কিশোর শিষ্য বিস্ময়ে ভরে উঠল। সে বলল— গুরুজি, জঙ্গলে গেলে আপনার সোহবত পাবো কীভাবে? আপনি তো নিজেই বলেছেন— এক জামানা সোহবতে আউলিয়া, বর বহত হাজার বছর বেরিয়া।

গুরু মৃদু হেসে তার দিকে তাকালেন— যেন সেই হাসির ভেতরেই লুকিয়ে আছে বহু অদৃশ্য শিক্ষা। তারপর ধীরে ধীরে বললেন— তুই কি কচ্ছপের কথা জানিস? কচ্ছপ বালুর ভেতর ডিম পেড়ে রেখে সাগরে ফিরে যায়। কিন্তু দূরে থেকেও সে তার দৃষ্টির উষ্ণতা, তার অদৃশ্য মমতা দিয়ে সেই ডিমের দিকে নজর রাখে। সময় হলে সেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়।

কচ্ছপের চোখেই যদি এত শক্তি থাকে, তবে মানুষের অন্তর-চোখের শক্তি কত গভীর হতে পারে ভাব! তুই যেখানেই থাকিস না কেন— আমি নীরব প্রার্থনায় তোর দিকে তাকিয়ে থাকব। সেই দোয়ার তাপে তোর অন্তরের চোখ খুলে যাবে। তুই একদিন অবশ্যই দিব্যজ্ঞানের স্বাদ পাবি।

গুরুর এই কথাগুলো কিশোর শিষ্যের হৃদয়ে এমনভাবে গেঁথে গেল যে, যেন সেই মুহূর্তেই তার জীবনের পথ বদলে গেল। তখনো সে সাধু হয়ে ওঠেনি, কিন্তু বিশ্বাসের একটি অদৃশ্য আগুন তার ভেতরে জ্বলে উঠেছিল। সেই আগুনই তাকে ধীরে ধীরে রূপান্তরিত করল দেহ থেকে আত্মায়— একদিন সে সত্যিই সাধু হয়ে উঠল।

আর এই গল্পটি আমি শুনেছি সেই সাধুরই এক শিষ্যের মুখ থেকে—যিনি এটিকে কোনো কল্পকথা নয়, বরং জীবনের এক গভীর সত্য হিসেবেই বলেছিলেন।

কচ্ছপের খামারে দাঁড়িয়ে যখন ছোট ছোট কচ্ছপকে পানিতে সাঁতার কাটতে দেখছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল— প্রকৃতির এই নীরব প্রাণীগুলোও যেন মানুষের আধ্যাত্মিক ভাবনার ভেতর এক গভীর প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

কখনো কখনো প্রকৃতি শুধু প্রকৃতি থাকে না; সে হয়ে ওঠে এক নিঃশব্দ উপমা— গুরু ও শিষ্যের অদৃশ্য সম্পর্কের, দূরত্ব পেরিয়ে পৌঁছে যাওয়া এক দয়াময় দৃষ্টির এবং বিশ্বাসের সেই রহস্যময় শক্তির— যা মানুষকে এক জীবন থেকে আরেক জীবনে রূপান্তরিত করে।

যেহেতু আমরা মুসাফির, তাই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে চলছিলাম। সিনিমন আইল্যান্ডের সৌন্দর্য পেছনে রেখে এবার আমরা রওনা হলাম জঙ্গল বিচের পথে। আমাদের সঙ্গে আছে আমাদের টুটু, এবং টুটুর মালিক—ডিনো ভিলার বিখ্যাত আঙ্কেল।

তাপচাপা থেকে মুক্তি পেতে আমরা ডাবজল খেয়ে নিলাম। শ্রীলঙ্কার ডাবের স্বাদ সত্যিই অনন্য— মধুর, সতেজ, প্রাণবন্ত। খারাপ লাগে না, অথচ ক্ষুধা যেন আরও বেড়ে যায়। স্বাভাবিকভাবে জল খাওয়ার আধা ঘন্টা বা এক ঘন্টা পর ডাকাতিয়া ক্ষুধা আসে পেটে। আর আমরা তো এমনিতেই ক্ষুধার্ত।

রাস্তার পাশে ছোট, পরিপাটি একটি দোকান দেখা গেল। পর্যটন এলাকা হওয়ায় দামও খুব বেশি নয়। সেখানে তারা রুটি বানায়— রুটির সাথে থাকে ঝাল জাতীয় কিছু— শুটকির ভর্তার মতো। তবে পিয়াজ ও মরিচের আধিক্য থাকে সেই ঝালে। সেই রুটি আর ঝাল মিশিয়ে আমরা প্রাণভরে খেয়েছি। আমি নিজে প্রায় সাত–আটটি রুটি খেয়ে ফেললাম। পরে টক দই খেলাম, তার পর হোমমেইড মিষ্টিও। তারপরও বিশ্রামের প্রয়োজন হলো না—পাগল না হই। হেঁটে চললাম জঙ্গল বিচের দিকে।

এখানে যানবাহনের রাস্তা শেষ। হাটতে হাটতে নিচের দিকে নামছি। চারপাশে ছায়াময়, সুশীতল পরিবেশ। মনে হচ্ছিল গাছ নয়— এগুলো যেন ঘর, ছাওনি। কিছু বানরও দেখলাম। গাছগুলো এত পুরনো, এত শক্ত, যেন প্রাচীন কোনো বনের গল্পকে বুকে ধারণ করেছে। মানুষের দল চিকন রাস্তা ধরে চিকনি চামেলি সমুদ্র সৈকত দেখার জন্য এগোচ্ছে। লতানো ডাল দেখে ইচ্ছে হলো—টারজানের মতো ঝুলে উঠতে।

অবশেষে চোখে পড়ল জঙ্গল-বিচের মনমুগ্ধকর দৃশ্য। চিকনি চামেলির মতো সাদা বালু, সাগরের নীল জল, সবই যেন এক সঙ্গীতের মতো। এই দৃশ্য কেবল শকুন্তলার বাহুযোগলের সৌন্দর্যের সঙ্গে তুলনা করা যায়, অথবা মহুয়া সুন্দরীর অনবদ্য রূপের সঙ্গে। এই বিচে প্রচুর সাদা চামড়ার মেয়েছেলে পুরুষমহিলা দেখি যাদের শরীর মেদহীন এবং তারা অখণ্ড অবসর মনে রোদ পোহাচ্ছে— কোনো তাড়াহুড়ো নেই যেনো কুমিরের মতো শান্ত স্থির।

সাদা চামড়ার মানুষরা শুয়ে আছে বালুতে, রোদ নিচ্ছে। বাচ্চারা আনন্দে লাফিয়ে পড়ে, নিজেরাই সাগরে ঢুকে খেলে। মোবারক ভাইয়ের মনও প্রশান্ত— কারণ এখানে মানুষ নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রকৃতির সাথে মিলেছে, শরীরের কোনো লজ্জা বা ভীতি নেই। এখানে নারী-পুরুষ নির্বিঘ্নভাবে স্নান করছে— প্রাকৃতিক আবহ এখানে উদার এবং নির্ভীক।

কিছু সময় বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বললাম—দারুণ মিশুক, প্রাণবন্ত। দূরে ফোর্টের রুক্ষ দেয়ালও দেখা যাচ্ছে যা সমুদ্র সৈকতকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। সকালবেলা এখানে আসলে হয়তো আরও স্বচ্ছন্দ, আরও নীরব, আরও স্বপ্নময় লাগত।

জঙ্গল অতিক্রম করে পৌঁছালাম জঙ্গল বিচে— শান্ত, নির্মল, এক অদ্ভুত শিহরণময় সমুদ্র সৈকত, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য, মানুষের নির্ভীকতা, এবং আবিষ্কারের আনন্দ একসাথে মিলিত হয়েছে।

গাছপালার নীরব শিবিরে পা ফেলতে ফেলতে কোথায় যাচ্ছি তা কিন্তু জানি না। যতই বিচের কাছাকাছি যাচ্ছি ততই শুনতে পাচ্ছি জলের গর্জন। কিন্তু কি কারনে গর্জন হচ্ছে তা ছিলো সম্পূর্ণ অধরা অভিজ্ঞতার কাছে। কোথায় যাচ্ছি তা মূখ্য হয়ে উঠেনি— যেখানে যাচ্ছি তা হয়তো সুন্দর হবে, যা দিয়ে যাচ্ছি তার থেকে তো নিজের মনকে বিয়োগ করতে পারছি না। ফলে যা পাবো, আর যা পাচ্ছি কোনটাই কম নয়। প্রকৃতির আস্তানা মাড়াতে মাড়াতে যাচ্ছি তো যাচ্ছি, হঠাৎ দেখি সাদা জল প্রকৃতি— সবুজ প্রকৃতি থেকে আস্তে আস্তে চোখ নেমে পড়ে সাদা জল প্রকৃতিতে এবং জলের নৃত্য এবং নৃত্যসহ জল সঙ্গীতে— যেনো গভীরতর প্রাপ্তি থেকে গভীরতম প্রাপ্তি— হে জঙ্গল বিচ, তুমি সুন্দর— সুন্দরতম এই শতাব্দীর।

ভারত মহাসাগরে যত সমুদ্র সৈকত দেখেছি তার মধ্যে এটি সবচেয়ে ফটোজেনিক। আয়তনে তত বড় নয়, বড় সে সৌন্দর্যে। এই ফটোজেনিক সমুদ্র সৈকতে বাচ্চারা আনন্দে খেলা করছে বালুকাবেলায়, লাফিয়ে পড়ছে সমুদ্রে। স্থল ও জলের নির্মল অক্সিজেন উপহার পাচ্ছে প্রতিটি ফুসফুস। সিনিমন ফুসফুসের জন্যে ভালো। তবে ভালো সিনিমন আমরা কতজন চিনতে পারি!?

শ্রীলঙ্কার Cinnamon Island–এ গিয়ে দারুচিনিকে নতুন করে চিনলাম। আমরা যাকে এতদিন শুধু রান্নার মসলা ভেবেছি, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক পুরো জীবন, এক ইতিহাস, এক নিঃশব্দ শিল্প। ছেলেটা আমাদেরকে সিনিমন গাছ দেখালো এবং দেখালো অর্জিনাল সিনিমন গাছ থেকে কেমন করে অর্জিনাল কপারের দন্ড দিয়ে ছাল উঠানো হয়— গাছের ছাল হয়ে উঠছিল সুগন্ধি দারুচিনি— আর আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম।

জানলাম, আসল দারুচিনি— যাকে বলে “Ceylon Cinnamon”—মূলত Sri Lanka–তেই জন্ম নেয়। এটি নরম, বহুস্তরযুক্ত, আর স্বাদে মৃদু। আর যে দারুচিনি আমরা বাজারে বেশি দেখি, তার অনেকটাই অন্য দেশের— ঝাঁঝালো, শক্ত, আর সবসময় স্বাস্থ্যকরও নয়। বিশ্বে দারুচিনির দুটি প্রধান ধরন আছে— Ceylon Cinnamon (True Cinnamon) যা খুব সহজে ভেঙে যায়, নরম। Cassia Cinnamon (সাধারণ দারুচিনি), উৎপন্ন হয় China, Indonesia, Vietnam–এ, যা শক্ত, ভাঙতে কষ্ট হয়। এই দ্বীপ থেকে বিদায় নেয়ার আগে ছেলেটির কাছ থেকে সিনিমন তেল কিনি এবং কিনি সিনিমন পাউডার এবং সিনিমন।

Ceylon Cinnamon-এর কথা এতোদিন জানতামই না যাতে কুমারিনের পরিমান পর্যাপ্ত থাকে এবং তা স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী। আহারে, ভালো কিছু জানবার আগে আমরা খারাপ কিছুতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি!

আরেকটি কথা— ছেলেটির বাবা এই দ্বীপে একাই এসেছিল, এখনো এই দ্বীপে তারা একাই আছে। প্রচুর পর্যটক আসে প্রতিদিন। দারুণ ব্যবসা। ব্যবসায় সফলতার কাহিনি আপনি বই পড়ে জানতে পারবেন না, সফল হতে গেলে একেবারে আলাদা কিছু করতে হয়, বইতে যা লেখা আছে তা নয়, আবার তা একেবারে ফেলে দিয়েও নয়, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাহলে শুনুন আরেকটা কাহিনি— ব্যবসার কাহিনি। বাংলাদেশে আমার এক ছোটো ভাই আছে। যখনই তার পরামর্শ দরকার হয় তখনই সে আমাকে ফোন দেয় অথবা সরাসরি দেখা করে। আমি তাকে পরামর্শ দিতে ভয় পায়। কারণ আমি যা বলি, সে হুবহু তা-ই করে। আমার কথা হলো পরামর্শ ইজ পরামর্শ,পরামর্শকে আদেশ মনে করার কোনো কারন থাকতে পারে না। পারিবারিক কোনো একটা উৎস থেকে তার কাছে পাচ লক্ষ টাকা আসে।

— ভাই এতো টাকা দিয়ে কি করবো? আমার তো মাসে দশ হাজার টাকা হলেই চলে।

—আমাকে দিয়ে দাও।

— ভাই, আপনার এ্যাকাউন্ট নাম্বার দেন।

— ধুর বেটা, মজা করলাম। একটা কাজ করো, এক হাজার ভরি রূপা কিনো।

আমার কথা শুনে সে দুই হাজার উনিশ সালে এক হাজার ভরি রূপা কিনে— চারশো টাকা ভরি। দুই হাজার ছাব্বিশ সালে হঠাৎ একদিন গভীর রাতে তাকে ফোন দেই। সে আতকে উঠে।

— ভাই, কোনো সমস্যা?

— না, কোনো সমস্যা নাই প্রভুর কৃপায়। ভুলে যাবো, তাই ঘুমানোর আগে তোমাকে ফোন দিলাম। কালকে সব ভরি রূপা বিক্রি করে দিবা।

— জ্বি ভাই।

এইভাবে আদেশের সুরে কখনো তার সাথে কথা বলিনি। সকালে ঘুম থেকে উঠে সে প্রথমে যে কাজটি করেছে তাহলো “রূপাবিক্রি”। রূপা বিক্রি করে সে পেয়েছে ৪৮ লক্ষ টাকা। মাত্র ছয় বছরে তার প্রোফিট ৪৪ লক্ষ টাকা মাত্র।

6 comments
pklucky81

Finally found a platform that actually feels lucky. The bonuses are generous and the customer support is surprisingly quick. Give pklucky81 a try.

8999bdapp

I’ve been using this app for a few weeks now and the interface is super smooth. Definitely one of the best experiences I’ve had lately. Check out 8999bdapp for more details.

inyono101

I love the daily rewards and the overall vibe of the platform. It feels secure and professional. Five stars for inyono101.

7gameasiaapk

The app version is so much better than the browser. Installation was a breeze and the graphics are top notch. Great job on 7gameasiaapk.

krmegawins

Finally found a platform that actually delivers on its promises. The game variety is impressive and I had a great experience with the support team. Highly recommend krmegawins

phlwinapk

The APK works perfectly on my Android phone. No lags and the gameplay is seamless. Great job on phlwinapk.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *