ভুটানে ঘুরে ঘুরে কিছু ফোটেজ ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। বিমান থেকে মেঘগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল বাতাসের ভূমিতে জন্ম নেওয়া সাদা ফুল। আসলে তারা তো কেবলই এক জনগোষ্ঠী— কুয়াশার মতো দলবদ্ধ জলকণা। তবু তাদের সাদা এত সাদা যে কখনো কখনো ফেনার চেয়েও কিংবা কিংবদন্তি ফেরেশতার চেয়েও বেশি উজ্জ্বল মনে হয়।
ভিডিওতে আছে পাবজিখা ভ্যালিতে হাঁটার কিছু দৃশ্য। জায়গাটি এমন এক নীরবতার অধিকারী যা মনে দীর্ঘদিন ধরে থেকে যায়। পাইন গাছের সারি এত সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে আগে দেখিনি। ভুটানের বাড়ি নির্মাণের দৃশ্যও আমাকে মুগ্ধ করেছে; অনেক সময় নির্মাণাধীন একটি বাড়ি নির্মিত বাড়ির চেয়েও বেশি সুন্দর ও দেখার মতো হয়ে ওঠে।
মেঘের খুব কাছে গিয়ে দেখেছি, সে আসলে বৃষ্টি হয়ে যায়। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ্যে যখন হাওয়ার উথাল-পাথাল মিশে থাকে, মেঘের ভেতর থাকা ঠিক তেমনই অনুভূতি। দূর থেকে মনে হয়, মেঘের মধ্যে শুয়ে থাকলে নিশ্চয়ই খুব ভালো লাগবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তা যেন ঝিরিঝিরি জলের মধ্যে শুয়ে থাকার মতো— সেখানে তেমন প্রশান্তি নেই, নেই কল্পনার সেই আরাম।
হয়তো এ কারণেই মেঘের সৌন্দর্যকে দূর থেকে সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগে। কাছে গেলে বোঝা যায়, তার অনেকটাই দৃশ্যের জাদু, অনেকটাই মরীচিকা। দূরত্ব কখনো কখনো সৌন্দর্যেরও একটি শর্ত।
আমরা প্রায় দেড় ঘণ্টা হেঁটেছি— আগে-পরে মিলিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়েছি। পাবজিখা ভ্যালির নীরবতার ওপর পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে আছে গ্যাংতে গোম্ফা। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন বৌদ্ধ মঠ যেন ভ্যালিটির আত্মা। শীতকালে তিব্বত থেকে আসা কালো-গলাযুক্ত সারস পাখিরা এই মঠের চারপাশে চক্কর দেয়— স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু বিশ্বাস নয়। পাবজিখা ভ্যালির জাদুঘরে সারসদের নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখেছিলাম; সেখানে এই দৃশ্যের ভিডিওও দেখানো হয়েছিল।
নেচার ট্রেইলে হাঁটতে হাঁটতে দেখি এক বৃদ্ধ বেতের ঝুড়ি বানাচ্ছেন। বয়স সত্তর না আশি— ঠিক বোঝা যায় না। আমাকে দেখে তিনি হাত বাড়িয়ে কিছু সাহায্য চাইলেন। আমি একটি ভুটানি নোট দিলাম। তিনি আরেকটি চাইলেন। সেটিও দিলাম। তারপর তাঁর চাওয়া শেষ হলো যেনো। মজার বিষয়, আমার পেছনে থাকা বিদেশি পর্যটকদের কাছে তিনি কিছুই চাননি।
সেদিন বিকেলে আবার একা একা হাঁটছিলাম পাবজিখা ভ্যালিতে। দূরে একটি ভারতীয় দম্পতিকে দেখলাম। কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু কথোপকথন আর এগোয়নি। ঠিক তখনই বাড়ি ফিরছিলেন আরেক বৃদ্ধা। বয়স আশি বা নব্বইয়ের কাছাকাছি। তিনিও আমার কাছে সাহায্য চাইলেন। একটি নোটেই তিনি খুশি। তারপর তাঁর কয়েকটি ছবি তুললাম। মনে হলো, টাকার চেয়ে ছবির আনন্দই যেন তাঁকে বেশি উজ্জ্বল করে তুলেছে।
পাবজিখার নেচার ট্রেইলে হাঁটতে হাঁটতে গাছের ডাক, ঘাসের বিছানা আর পাহাড়ি বাতাস শরীর ও মনের অনুভূতিকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। পথে পথে বিশ্রামের জন্য কয়েকটি জায়গা আছে। কিন্তু বিশ্রাম কেন নেব? ক্লান্তি তো আসেই না। বরং প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করলাম— অধিক সৌন্দর্যও কখনো কখনো ক্লান্তিনাশক হতে পারে।
নেচার ট্রেইলের প্রায় শেষ প্রান্তে একটি কফিশপ। সেখানে বসে এক কাপ এসপ্রেসো কফি খেলাম— শিরাগুলো আরও চাঙা হয়ে উঠেছে।
কালো-গলাযুক্ত সারসেরা যখন শীত শেষে ফিরে যায়, তখনও তারা কয়েকবার গ্যাংতে গোম্ফার চারপাশে চক্কর দেয়, তারপর দীর্ঘ উড়ালে হারিয়ে যায় আকাশে। হয়তো ভ্যালির সবচেয়ে উঁচু জায়গাটিকে তারা উড্ডয়নের প্রস্তুতিস্থল হিসেবে ব্যবহার করে। হয়তো এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে। মানুষের মতো পাখিদেরও নিশ্চয়ই কিছু ব্যক্তিগত রহস্য থাকে।
পাবজিখার নেচার ট্রেইল নিয়ে যদি এক বাক্যে কিছু বলতে হয়, আমি বলব— ফুলের ভেতর দিয়ে হাঁটলে যেমন লাগতে পারে, আমার অনুভূতিটা ছিল ঠিক তেমন। মনে হচ্ছিল, আমি কোনো পথের ভেতর দিয়ে নয়, একটি অনুভূতির ভেতর দিয়ে হাঁটছি।










