emranorreja.com

এমরানুর রেজার কবিতা, গল্প, ভ্রমন, ভাষা বদল, মত-দ্বিমত, ছায়াছবি, বই রিভিউ, জলেশ্বরী, থিয়েটার ও আড়াইসিধা দিয়ে সাজানো…

Advertisement

জংখা ভাষা

পোনাখার হোটেল রোজাতে Damcho Choden এর সাথে আমার দেখা। অসম্ভব সুন্দর মনের এক মানুষ। দশম শ্রেণি সেই অর্থে তার শেষ করা হয়নি, জীবিকার তাগিদে তাকে কাজের পথে নামতে হয়েছে। তার বাড়ি ফুন্টশোলিং— যতদূর মনে পড়ে। বাড়ি ফেরার সুযোগও খুব কম তার।

হোটেল রোজার ডাইনিং আর সেখানে থাকা Tashi Tshomo এবং Damcho Choden এক সরল গোছানো আত্মা— এই মানুষগুলোর ভেতর এক ধরনের সরলতা ছিল, যাদের দেখে অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল কোনো এনিমে সিরিজের দ্বীপ-জীবনের চরিত্রদের কথা— বিশেষ করে One Piece-এর সেই নির্জন, মানবিক অধ্যায়ের মতো।

হোটেল কর্তৃপক্ষ ডেন্টাল কিট দেয়নি। তাই ব্রাশ আর পেস্ট কিনতে যেতে হলো স্থানীয় দোকানে। পাহাড়ি পথ ধরে নিচে নামলাম আমরা— অন্ধকার, নীরবতা আর হালকা কুয়াশার ভেতর প্রায় দশ মিনিটের হাঁটা। সে হাঁটছিল, আর তার মনের কথা খুব সহজভাবে বলে যাচ্ছিল। আমি শুধু শুনছিলাম—গভীর মনোযোগে, শব্দগুলো যেন গিলে নিচ্ছিলাম।

আমাদের এই ছোট্ট যাত্রাটা হোটেল মালিক বা গাইডের চোখ খুব স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। শাষনের সুরে চোডেনকে কি যেনো ভাষন দিচ্ছিল হোটেল মালিক— আমি তখনই এগিয়ে গিয়ে বললাম—“আপনার স্টাফ খুব স্মার্ট, সে আপনার হোটেলের মর্যাদা বাড়ায়।” চোডেন সেটা শুনে খুব খুশি হলো। তার চোখে একটা নীরব কৃতজ্ঞতা যেনো বয়ে গেলো।

পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে আমরা যখন হাঁটছিলাম আর কথা বলছিলাম তখন সে বারবার বলছিল তার কোনো স্বপ্ন নেই। কিন্তু আমি ধীরে ধীরে তাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম স্বপ্ন ছাড়া জীবন অনেকটা একই পথে ঘুরে চলা এক অনন্ত পুনরাবৃত্তি।

কথা বলায় সে ছিল ভীষণ সাবলীল। তার ভেতরের সহজতা, স্পষ্টতা আর নীরব আত্মবিশ্বাস আমাকে ভাবিয়ে তোলে—তার একটা আলাদা ইন্টারভিউ নেওয়া দরকার, শুধু তার স্বপ্ন আর সংগ্রাম নিয়ে।

সময় করে আমি সত্যিই তার সেই ইন্টারভিউ নেই Dzongkha language–তে সেখানে সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের স্বপ্নের কথা, সংগ্রামের কথা বলে যায় কোনো জড়তা ছাড়াই, একদম সরলভাবে।

তার কথা বলার এই সাবলীলতা আমাকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে ভাষাটি নিজেই যেন তার স্বভাবকে ধারণ করেছে। জংখার এই স্বাভাবিক, ঝরঝরে প্রকাশভঙ্গি তার ব্যক্তিত্বের সাথেও অদ্ভুতভাবে মিলে যায়।

পাহাড়, ভাষা আর একজন মানুষের ভেতরের গল্প— সব মিলিয়ে সেই সাক্ষাৎটা কেবল একটি ইন্টারভিউ ছিল না, ছিল এক ধরনের নীরব উপলব্ধি।

ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয় কেবল— এটা চিন্তার গঠন, সংস্কৃতির শ্বাস-প্রশ্বাস। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই বাংলা ভাষা এবং ভুটানের Dzongkha language– এর দিকে তাকালে এক ধরনের অদ্ভুত সাদৃশ্য চোখে পড়ে, আবার একই সঙ্গে স্পষ্ট কিছু পার্থক্যও ধরা দেয়।

বাংলা ভাষার মতোই জংখার মৌলিক বাক্যগঠন সাধারণত কর্তা + কর্ম + ক্রিয়া (SOV)। যেমন বাংলায় আমরা বলি— “আমি বই পড়ি”, তেমনি জংখায় বলা হয়— “Nga pecha lokpa” (আমি বই পড়ি)। অর্থের বিন্যাস একই: আগে কর্তা, তারপর কর্ম, শেষে ক্রিয়া। এই মিল কেবল ব্যাকরণগত নয়—এটা চিন্তার প্রবাহেরও এক ধরনের মিল, যেখানে কাজটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো উহ্যতা বা ellipsis-এর ব্যবহার। বাংলা ভাষায় আমরা অনেক সময় সম্বোধন বা শুভেচ্ছায় কর্তা বা ক্রিয়া বাদ দিই—“নমস্কার”, “কেমন আছো?”—পূর্ণ বাক্য না বলেও অর্থ স্পষ্ট হয়। জংখাতেও একই প্রবণতা দেখা যায়। যেমন “Kuzuzangpo la”— এটি একটি পূর্ণ বাক্য নয়, কিন্তু সামাজিক প্রসঙ্গে সম্পূর্ণ অর্থ বহন করে। এখানে ভাষা যতটা না ব্যাকরণনির্ভর, তার চেয়ে বেশি প্রসঙ্গনির্ভর।

তবে জংখার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো— কথ্য ও লিখিত রূপের মধ্যে সুস্পষ্ট দূরত্ব। কথ্য জংখা তুলনামূলকভাবে সহজ, সংক্ষিপ্ত ও দ্রুত; অনেক ব্যাকরণগত অংশ প্রসঙ্গ অনুযায়ী উহ্য থাকে। কিন্তু লিখিত জংখা অধিকতর মানক, আনুষ্ঠানিক এবং তিব্বতি লিপিভিত্তিক ব্যাকরণ অনুসরণ করে। ফলে একই অর্থ কথায় ও লেখায় ভিন্ন কাঠামোয় প্রকাশিত হতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যকে ভাষাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায় diglossia— একই ভাষার দুই স্তরের ব্যবহার।

বাংলার ক্ষেত্রেও কথ্য ও লিখিত রূপের পার্থক্য আছে, তবে জংখায় এই ব্যবধান তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান। কথ্য ভাষা সেখানে জীবন্ত, চলমান নদীর মতো; আর লিখিত ভাষা অপেক্ষাকৃত স্থির, নিয়মবদ্ধ মানচিত্রের মতো।

সব মিলিয়ে বলা যায় বাংলা ও জংখা, দুই ভাষাই SOV কাঠামো, প্রসঙ্গনির্ভরতা এবং উহ্যতার ব্যবহারে একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। কিন্তু জংখার কথ্য ও লিখিত রূপের মধ্যে যে স্তরভিত্তিক পার্থক্য, তা ভাষাটিকে আরও জটিল ও আকর্ষণীয় করে তোলে।

ভাষা শেষ পর্যন্ত শুধু শব্দের বিন্যাস নয়— এটা মানুষের চিন্তার ভেতরের নীরব স্থাপত্য। আর সেই স্থাপত্যের ভেতরেই বাংলা ও জংখা যেন দুই ভিন্ন দরজায় দাঁড়িয়ে একই মানবিক অভিজ্ঞতার কথা বলে।