emranorreja.com

এমরানুর রেজার কবিতা, গল্প, ভ্রমন, ভাষা বদল, মত-দ্বিমত, ছায়াছবি, বই রিভিউ, জলেশ্বরী, থিয়েটার ও আড়াইসিধা দিয়ে সাজানো…

Advertisement

গরীব, নিরিখ ও ভাটি ভাষার গল্প

আরবিতে একটি শব্দ আছে غريب (উচ্চারণ: ঘোরীব)। এই ঘোরীব থেকে বাংলা গরীব শব্দের আমদানি। আরবিতে غريب (উচ্চারণ: ঘোরীব) শব্দের বাংলা হলো অদ্ভুত, অস্বাভাবিক, অচেনা যার ইংরেজি হলো “Weird”। কিন্তু বাংলা ভাষায় গরীব শব্দটা অর্থহীন, সহায়সম্পত্তির কমতি বা ঘাটতিকে ইঙ্গিত করে। পুরো বাংলাদেশে একটি কথা প্রায় প্রবাদবাক্যের মতো হয়ে গ্যাছে— “গরীব গজবের সৃষ্টি”— এখন অবশ্যই এই কথার শক্তিগত জায়গা পরিবর্তন হয়েছে। তবে একটি প্রশ্ন কিন্তু থেকে যায়— অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়, নাকি নষ্ট স্বভাবে অভাব আসে?

বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল বা ঈসা খাঁর অঞ্চলের মানুষ গরীব শব্দের উচ্চারণ করে গুরিব— হে একটা গুরিব মানু, হের লগে বারাবারি করিছ না।

ঈসা খাঁকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের মানুষ ইছাহা বলে— এই অঞ্চলের প্রচুর মানুষের নাম আছে ইছা মিয়া। রাজা না হতে পারলেও রাজার নাম রেখে রাজা রাজা একটা ফিল নেয়ার চেষ্টা আর কি। ঈসা খাঁর শাসনামল বাংলার অত্যন্ত প্রভাব বিস্তারকারী প্রবাহচিহ্নের নাম— ঈসা খাঁ ছিলেন বাংলার ইতিহাসের এক অসাধারণ নেতা, যিনি বারো ভুঁইয়াদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ছিলেন। তাঁর শাসনকেন্দ্র ছিল ভাটি বাংলা—এক বিস্তৃত জলাভূমি, খাল-বিল ও নদীবেষ্টিত অঞ্চল। এই ভাটিতে মেঘনা, তিতাস ও বাঁশাই নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ছিল, যা তাঁর সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে আরও মজবুত করত।

ঈসা খাঁর প্রভাব বর্তমান ঢাকার আশপাশের এলাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাঁর প্রধান দুর্গ ও রাজধানী ছিল জঙ্গলবাড়ি, যা কিশোরগঞ্জে অবস্থিত— সোনারগাঁও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক ঘাঁটি হিসেবে সমাদৃত—
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুরো অঞ্চল তাঁর অধীনে ছিল না, তবে নদীভিত্তিক দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের উল্লেখযোগ্য অংশ অবশ্যই তাঁর প্রভাবাধীন ছিল। নদীভিত্তিক যুদ্ধকৌশল এবং নৌবাহিনী ব্যবহার করে তিনি মোঘল শক্তির বিস্তারকে বারবার প্রতিহত করেন।

ঈসা খাঁ কেবল ভূখণ্ডের শাসক ছিলেন না, তিনি ভাটি বাংলার সাহস, স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয়ের এক প্রতীক— তাঁর শাসনাধীন অঞ্চল আজও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে বিবেচিত।

বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে অন্যতম কেদার রায়। কেদার রায়ের বিধবা কন্যা স্বর্ণময়ীকে অপহরণ করে ঈসা খান— তাতে রেগে গিয়ে কেদার রায় ঈসা খানের রাজধানী আক্রমণ করেন । কেদার রায়ের আক্রমণে ঈসা খান প্রাণভয়ে মেদিনীপুর পালিয়ে যায়। কেদার রায় ঈসা খানের প্রায় সম্পূর্ণ জমিদারির দখল নিয়ে নেন। ঈসা খান অজ্ঞাত রোগে তার স্ত্রী ফাতেমা খানের বাড়ি ফুলহরি (ফুলদি) জমিদার বাড়িতে ১৫৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মারা যায়।

বারো ভূঁইয়াদের আলোচনা করতে করতে একটি শব্দ মাথায় চলে আসছে। আর শব্দটা হলো ‘হিরিক’। বারো ভূঁইয়াদের অঞ্চলের মানুষ হিরিক শব্দটা ব্যবহার করে ঘন জমায়েত বুঝাতে— আম অহনে হস্তা, আম কিনার হিরিক লাগঝে চহে। হিরিক শব্দটা মূলত ইংরেজি শব্দ Hayrick (হেরিক) থেকে আগদ। মূলত খোলা মাঠে খড় বা শস্য শুকিয়ে রাখার জন্য যে বড় স্তূপ তৈরি করা হতো, তাকেই ‘Rick’ বলা হতো। পরবর্তীতে এর সাথে ‘Hay’ যুক্ত হয়ে ‘Hayrick’ শব্দটি সুনির্দিষ্টভাবে খড়ের গাদাকে বোঝাতে শুরু করে। ব্রিটিশ ইংরেজিতে শরীরের কোনো অংশ (বিশেষ করে ঘাড় বা পিঠ) হঠাৎ মোচড় লেগে ব্যথা পাওয়া বা মচকানোকে ‘rick’ বলা হয়। বাংলা বা সংস্কৃত শব্দ ‘ঋক’ (Ṛc) এর অর্থ হলো প্রশংসা, স্তোত্র বা পবিত্র মন্ত্র, যা হিন্দুধর্মের প্রাচীন গ্রন্থ ‘ঋগ্বেদ’-এর মূল ভিত্তি।

তাহলে হিরিক লাগছে মানে খেড় যেমন গোল করে এক জায়গায় একত্রিত করা হয় তেমনি বিভিন্ন জায়গার মানুষ যখন এক জায়গায় একত্রিত হয় কোনো উদ্দেশ্যে তখন তাকে হিরিক বলে। খেড় এক জায়গায় একত্রিত করে গোল করে রাখার পর কম্বোজের মতো যে অবস্থা দৃশ্যমান হয় তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের মানুষ বনগোলা বলে। খেড়কে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের মানুষ ‘বন’ বলে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে রোদে শুকানো ধান গাছকে ‘বন’ বলে। বনগোলা/বনগুলা মানে রোদে শুকানো ধান গাছের সজ্জিত স্তুপ।

মচকানোকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের মানুষ ‘মছকা’, ‘মইচকা’ বলে। আর শরীরের কোনো অংশ মচকানোর ফলে যে ব্যথা হয় তাকে মইচকাবেতা বলে। এই ব্যথা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যে গ্রামীণ যে চিকিৎসা পদ্ধতি চালু আছে তাকে মইচকাজারা বলে। মইচকাজারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে যেমন বিখ্যাত তেমনি নরসিংদীর চরাঞ্চলেও তার দারুণ সুখ্যাতি রয়েছে। তেল আর লবন দিয়ে ব্যথার স্থানে আস্তে আস্তে মালিশ করে এবং মালিশকারী ব্যক্তি মনে মনে এক মন্ত্র পরে— এই প্রক্রিয়াই মূলত মইচকাজারা। আমি অনেক কষ্টে আমার এলাকাতো দাদির কাছ থেকে এই মন্ত্র শিখে নিয়েছিলাম। তিনি আমাকে মন্ত্রটা কাউকে জানাতে নিষেধ করেছেন। তাই জানালাম না।

হিরিকের মতো আরেকটি শব্দ আছে। শব্দটা হলো নিরিখ। বৈষ্ণব পদাবলি বা লোকজ গানে ‘নিরিখ’ বলতে অনেক সময় একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকা বা লক্ষ্য করাকেও বোঝানো হয় (সংস্কৃত ‘নিরীক্ষণ’ থেকে প্রভাবিত)। কোনো জিনিসের বর্তমান দাম বা নির্ধারিত হারকে নিরিখ বলা হয় (যেমন: “বাজারের নিরিখ বুঝে সওদা করো)। কালু শাহ ফকিরের লেখা একটি গানে নিরিখ শব্দের উচ্চারণ দেখা যায়—

নিরিখ বান্ধরে দুই নয়নে, ভুইলনা মন তাহারে….
ঐ নাম ভুল করিলে, যাবিরে মারা
পরবিরে বিষম ফেরে
ভুইলনা মন তাহারে….।।

কালু শাহ ফকির রচিত ‘নিরিখ বান্ধরে দুই নয়নে’ একটি গভীর আধ্যাত্মিক বাউল গান। এ গানের দৃশ্যমান অর্থ হলো—মনের চঞ্চলতা দূর করতে গুরুর ধ্যানে থাকা বা স্মরণে থাকা— আপন মুর্শিদের ধ্যানে চোখ ও মন নিবদ্ধ রাখা। গুরুর দিক থেকে দৃষ্টি ফেরালে বা নাম ভুলে গেলে আধ্যাত্মিক মৃত্যু ঘটে এবং বিষম ফেরে (সংসার ফাদে) পড়তে হয়। এখানে নিরিখ মানে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা অথবা মানসিক সম্পর্ক স্থাপন করা— সুফিভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলে ফানা ফি শায়েখ (فناء في الشيخ)— নিজের অহং, ইচ্ছা ও ব্যক্তিগত মতকে আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশনার কাছে বিলীন করে দেওয়া।

“ফানা” মানে বিলীন হয়ে যাওয়া, “ফি” মানে মধ্যে, আর “শায়েখ” মানে আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। অর্থাৎ মুরিদ (শিষ্য) যখন তার শায়েখের নির্দেশনা ও আদর্শকে সম্পূর্ণভাবে অনুসরণ করতে শুরু করে, তখন ধীরে ধীরে তার নিজের অহং ভেঙে যায়— এটাকেই বলা হয় ফানা ফি শায়েখ। অবশ্যই আরও টেকনিক্যাল বিষয় আছে যা কহতব্য নয়, চর্চার বিষয়। সুফিসাধনার পথে এটিকে অনেক সময় একটি ধাপ হিসেবে ধরা হয়। সাধারণত বলা হয়—
প্রথমে ফানা ফি শায়েখ,
তারপর ফানা ফি রাসূল,
আর শেষ পর্যন্ত ফানা ফিল্লাহ— অর্থাৎ আল্লাহর প্রেম ও ইচ্ছার মধ্যে নিজের সত্তাকে সমর্পণ করা।

বাউল এবং সুফিপথের ডেসটিনি প্রায় এক হলেও পথপ্রক্রিয়া আলাদা। আলাদাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নরসিংদী কিশোরগঞ্জ এবং নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের মানুষ উচ্চারণ করে “আলগা”— বর্ষাকালে আলগা বাইত যাইতাম নাও দিয়া।

ইদানিং বাউলকে মহাজনি গান বলেন অনেকে। তারা বলে, বাংলা লোকসংগীতে বাউল গানের আরেকটি পরিচিত নাম হলো মহাজনি গান। এখানে “মহাজন” বলতে সাধারণ অর্থে ধনী ব্যবসায়ী বোঝানো হয় না; বরং বোঝানো হয় মহান আধ্যাত্মিক সাধক বা গুরুদের— যারা জীবন, প্রেম, আত্মা ও মানবতার গভীর সত্য নিয়ে গান ও বাণী রেখে গেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে—

বাওলা গান হাওলায় চলে না।

আসলেই বাউলা গান হাওলায় চলে না। হাওলা শব্দটি এসেছে আরবি “হাওয়ালা (Hawala)” থেকে। মূল অর্থ ছিল দায়িত্ব বা অর্থ অন্যের কাছে স্থানান্তর করা। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি পরে ধার দেওয়া/নেওয়া অর্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে হাওয়ালা (Hawala) শব্দটা উচ্চারিত হয় “হাওলাত” হয়ে— টেহা হাওলাত নিলে ঠিক সময়ে ফেরত দিতে অই।

6 comments
pkgamepkvip

This platform feels built by actual gamers rather than faceless corporations. The game selection rotates nicely and I love the transparent stats on my play history. My VIP manager even reached out to wish me well before my birthday. pkgamepkvip

mxroyal777bet

Looking for a place where strategy actually pays off can be tough but I finally found a network that respects skilled players. The VIP program feels genuine and the live dealer tables run without any lag. I enjoy the competitive atmosphere and the quick cashouts keep me coming back. Experience it yourself mxroyal777bet

topanwinslot

As a dedicated slot hunter I can confidently say the game selection here is top tier. From classic fruit machines to high volatility adventure themes there is something for every mood. The hit frequency feels honest and the bonus rounds actually trigger regularly. Give topanwinslot a spin and enjoy the thrill

evoplaycasino

The graphics and game variety here are just on another level. It feels like a premium casino experience. Visit evoplaycasino today!

brvx777

Solid platform with a great vibe. I managed to hit a decent win yesterday and the withdrawal was fast. Cheers to brvx777 for the awesome service.

luckyplayphlogin

Best login portal I have used for this game. No more broken links or downtime, just straight to the fun at luckyplayphlogin.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *