প্রান্তিক। প্রান্তিক রেলওয়ে স্টেশনে আসলাম চাঁদকে দেখবো বলে। এখানে আসলে জীবনানন্দ দাশের নগ্ন নির্জন হাত কবিতাটির কথা মনে পড়ে। এটি রেলওয়ে স্টেশন হলেও ট্রেন যথারীতি থামে না। থামে হাজার বছর পর পর। চাঁদের দিকে চেয়ে আছি। চেয়ে চেয়ে কয়েকবার কমলালেবু কবিতাটি পাঠ করে নিলাম। চারটি কালো তার চোখের সামনে ঝুলে আছে। চাঁদের সামনে কালো রং। বেশ ভালো লাগছে। চাঁদ আর কালোর কম্বিনেশন যে এতো ভালো হয় আজগে জানলাম।
রতনপল্লী থেকে হাঁটতে হাঁটতে প্রান্তিকে পৌঁছে যাই। দিগন্তপল্লী আসার পর অন্ধকার নেমে আসে। অন্ধকার নয়, প্রায় অন্ধকার। দিন নয়, প্রায় দিন।
মায়া। লিজা। ছুটকি।
এরা দিগন্তপল্লীর বাসিন্দা। আমাকে দেখামাত্র টিস করতে আরম্ভ করে। বিষয়টি খুব ইন্টারেস্টিং। আই এম ইন্টারেস্টেড৷ সাইকোলজি বলে যারা টিস করে তাদের প্রত্যেকের ভেতরে সুপ্ত গল্প থাকে। গল্প বলার সঠিক জায়গা পাই না বলে তারা বিশৃঙ্খল অভ্যাসের দিকে যায়।
আস্তে করে হাঁটা থামিয়ে দিলাম। সামনে না গিয়ে পেছনে যেতে লাগলাম। তাদের হাসির ঢল আরও বেড়ে গেল।
তোমরা বলত পারো কীভাবে প্রান্তিক যাবো?
এই রাস্তা দিয়ে সোজা, তারপর হাতের বায়ে।
আমি আবার হাঁটতে লাগলাম। একটু সামনে যাওয়ার পর ছুটকি শিয়াল ডাক শুরু করে। সে কী আমাকে ভয় দেখাতে চায়?
আমি আবার তাদের কাছে গেলাম।
এই রাস্তা দিয়ে গেলে কোনো সমস্যা হবে না ত?
না, কোনো সমসসা হবে না।
আমার যে ভয় করছে।
এবার লিজা মুখ খুলে।
মায়া তুই যা না, দিয়ে আই ( বিলাসী গল্পের কথা মনে পড়ে, বিশেষ করে সেই লাইনটি “একলা যেতে ভয় করবে না তো?”)
মায়া ঘর থেকে ওড়না দিয়ে আসে। এবার তিনজন আমাকে রাস্তা দেখানোর কাজে ব্যস্ত। আমিও হাঁটছি, তারাও হাঁটছে।
ছুটকি বোবা। কথা বলতে পারে না। কিন্তু শিয়ালের ডাক ডাকতে পারে। লিজা বিহারের মেয়ে। বেড়াতে এসেছে। মায়া বিবাহিত। তার স্বামী মুসলমান। নিকট বাজারে তরিতরকারি বিক্রি করে।
মায়া তোমার নাম ত খুব সুন্দর।
মা রেখেছে, মায়া ছাড়া কিছু হয় না, চাঁদ সূর্য সব কিছু মায়ার ফসল ( সে প্রমিত হিন্দিতে বলেছে)।
আমি তার কথা শুনে মুগ্ধ হয়েছি। আবার ভাবছি এতো সুন্দর চিন্তা যে ধরে রেখেছে সে আমাকে টিস করতে পারলো!
দিগন্তপল্লী গ্রামের শেষ মাথা পর্যন্ত তারা আসে।
সোজা চলে যাবেন, তিন মিনিটের মতো লাগবে।
ভয় করছে, যদি ডাকাত ধরে…
আরে না না, আমাদের চেয়ে এখানে বড় ডাকাত কে!
আমি আরও মজা পেলাম। মেয়ে ডাকাত! বুঝতে পারলাম তারা এই এলাকার সত্যিকারের দুষ্টের দল। ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক গল্প করে নিলাম। তারা বেশ মজা পেলে, আর আমি পেলাম হিউম্যান সাইকোলজির সোস্যাল কন্সপিরেসী।
চলে আসবো। তারা তাকিয়ে আছে। আবার তাদের কাছে গেলাম। গিয়ে আস্তে করে বললাম ‘এই এলাকার আমি সব চিনি’।
এবার বোমা ফাটল। আপনি থেকে তুমিতে নেমে আসলো।
তুমি তো ভারী বদমাশ…
আমি হাসতে হাসতে প্রান্তিক রেলওয়ে স্টেশনে চলে আসলাম। চাঁদ আমার জন্য বসে আছে। আমি গেলে চাঁদের মুখ ফর্সা হবে আমি জানি। এসে দেখলাম প্রান্তিক চুপচাপ কিন্তু চাঁদের মুখ বিবর্ন।
চাঁদের মন খারাপ থাকলে সময় দিতে হয়। মন ভালো করার চেষ্টা করা বোকামি। প্রকৃতি নিয়ম মেনে মন খারাপ করে আবার নিয়ম মেনে মন ভালো করে ফেলে। তাই চাঁদের মনও ভালো হয়ে যাবে, দেখবো তার উজ্জ্বল হাসি।
এই ত চাঁদের মন ভালো হয়ে গেছে। আমি আর সে পাশাপাশি বসে আছি। আমি আছি পৃথিবীতে আর সে আছে আকাশে। তার আর আমার মাঝে বছর বছর দূরত্ব তবুও সে আমার মনের আত্মীয় ….






Leave a Reply