ডাক্তার আইরিনের প্রথম দেখা পাই ট্রেনে। চা গরম সিনেমার ট্রেনে। পুরো সিনেমাতে ট্রেনের ভেতর শট একটিই। এই শটের সাইকোলজি হলো ডাক্তার এবং রোগীর মধ্যে মানসিক দূরত্বের কারন আবিষ্কারের একটি কচ্ছপ চেষ্টা। এই চেষ্টায় সফল হতে গেলে আরও গভীরে যেতে হবে। সেই গভীরতার নাম মানুষের ইকোনমি লাইফ এবং শিক্ষা লাইফ। চা গরম সিনেমাটিতে অবহেলিত চাশ্রমিকশ্রেনির করুনদৃশ্য দেখানো হয়েছে, অবহেলিত হওয়ার কারনদৃশ্য দেখানো হয়নি।
সিনেমা শুরু হয় ড্রোন শটের মধ্য দিয়ে যেখানে চাবাগান দেখা যায়, তার পরপরই পূজাভোগদৃশ্য যেখানে একধরনের চাবাগানস্থ বিশ্বাস প্রকট হয়ে উঠে। প্রকৃতি এবং লোকজ বিশ্বাস দিয়ে সিনেমা শুরু হয়, নন্দিনির পরিশ্রমের ফলজয় দিয়ে সিনেমা শেষ হয়— যা লোকজ জীবনবোধ থেকে বৈজ্ঞানিক জীবনাচারে পর্দাপন প্রক্রিয়ার সিনেমিক ট্রিটমেন্ট।
চা গরম— পরিচালনায় শঙ্খ দাশগুপ্ত— শুধু একটি ওয়েবফিল্ম নয় বরং আমাদের সমাজের এক অবহেলিত বাস্তবতার নির্মম অথচ সংবেদনশীল প্রতিচ্ছবি।
চরকি, Oxfam in Bangladesh এবং European Union-এর সহায়তায় নির্মিত এই কাজটি শুরু থেকেই আলাদা মনোযোগ দাবি করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে তা হলো— এর গল্প বলার ভঙ্গি এবং চরিত্রগুলোর জীবন্ত উপস্থিতি।
শুনুন— বাংলায় একটি প্রবাদ আছে— সাগরে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কিসের ভয়। চাশ্রমিক, যাদের সাগরসম কষ্ট বেদনা যাতনা, তাদেরকে ধারণ করবে এমন নির্মিত গল্প আমরা এখনো পাইনি, আর সেই গল্পে প্রাণ দিবে এমন অভিনয়প্রাণ পাওয়ার কাজটা এতটাও সহজ নয়— তবে চা গরম কঠিন কাজটাকে সহজ করার পথে সহায়তা করেছে— বিভাত আসবেই এমন ডকুফিল্ম টাইপের কাজ চলতে থাকলে, বিভাত আসবেই অভিনয় জগতে এমন ওয়েবফিল্ম টাইপের কাজ চলতে থাকলে।
এমন মানে কেমন?
তাহলে বলছি। যেখানে মানবিক মূল্যবোধ থেকে গল্পবোধ জন্মে এবং গল্পবোধ থেকে লাইট ক্যামেরা এ্যাকশন হাটতে চলতে এবং দৌড়াতে শুরু করে।
সিনেমায় আইরিন চরিত্রে সাফা কবির নিজেকে ভেঙে নতুনভাবে হাজির করেছেন। তার পারফরম্যান্সে যে পরিমিতিবোধ, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। কমেডি, আবেগ, দ্বিধা— সবকিছুতেই সে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক পরিমিতিবোধ সমান। আমার কাছে এটি তার এখন পর্যন্ত সেরা কাজ বললে খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে না। মিঠু চরিত্রে পার্থ শেখ বরাবরের মতোই নির্ভরযোগ্য। তবে সবচেয়ে বড় চমক হয়ে উঠেছেন রবিন দা চরিত্রে রেজওয়ান পারভেজ। তার অভিনয় এতটাই স্বাভাবিক যে, চরিত্র আর অভিনেতার সীমারেখা যেন মুছে যায়। কোথাও কোথাও তাকে দেখে রাজেশ শর্মা-র কথা মনে পড়েছে।
কি বলেন তো— চা গরম সিনেমাটিকে মূলত তিনটি স্তরে ভাগ করে দেখতে চাই— শহরের চরিত্র, চা-বাগানের শ্রমিক চরিত্র, আর বাবু/ম্যানেজার চরিত্র। শহরের মানুষগুলো স্পষ্টতই প্রিভিলেজড— তাদের ভাষা, দৃষ্টিভঙ্গি, এমনকি সমস্যা দেখার ভঙ্গিও আলাদা। অন্যদিকে, চা-বাগানের শ্রমিকরা চরম আনপ্রিভিলেজড— তাদের জীবন শুধু কষ্টের নয়, একধরনের নীরব বন্দিত্ব। আর মাঝখানে যে বাবু বা ম্যানেজার চরিত্র— সে আপোষকামী। ম্যানেজার বা বাবু চরিত্রটিকে অনেকেই হয়তো “No Man’s Land” ভাবতে পারেন— কিন্তু সে আসলে ঠিক তা নয়। সে কোনো শূন্য ভূখণ্ড না বরং এক জীবন্ত বাফার জোন— উপরের ক্ষমতা আর নিচের বঞ্চনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক আপোষকামী সত্তা। তার সহানুভূতি আছে, কিন্তু তা প্রতিরোধে রূপ নেয় না; তার অবস্থান আছে, কিন্তু তা অবস্থানহীনতার মতোই অনিশ্চিত। সে যেন দুই দিকের টানাপোড়েনে আটকে থাকা এক মানুষ— যে না পুরোপুরি মালিকপক্ষের, না পুরোপুরি শ্রমিকের। এই মাঝামাঝি অবস্থানই তাকে সবচেয়ে বেশি মানবিক এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি অসহায় করে তোলে— আর ঠিক এখানে এ কে আজাদ সেতুর সেতুময় অভিনয় একেবারে চায়ের মধ্যে যেনো চিনি— ভালো কিন্তু সমালোচনা আছে। সমালোচনা কোথায় তাহলে? সমালোচনাটা হলো তিনার গাম্ভীর্য তেমন করে প্রকাশ পায়নি, গাম্ভীর্য অহংকারের রূপ নিয়েছে।
নন্দিনীর বাবার মদ্যপান কিংবা মৃত্যুঞ্জয়ের বারবার “মরে গিয়েও বেঁচে থাকা”— এসব কেবল প্রতীক নয়, এগুলো এক ধরনের রাজনৈতিক ভাষা। প্রশ্নটা এখানে— চা-বাগানে মদ এত সহজলভ্য কেন? এটা কি নিছক অভ্যাস, নাকি পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণের অংশ? এই জায়গাতেই সিনেমা কিছুটা থেমে যায়। মৃত্যুঞ্জয় আসলে বেঁচে আছে— কিন্তু কীভাবে, কেন— এই অস্তিত্বের প্রশ্নটাকে পরিষ্কার করে না। যেন বাস্তব আর প্রতীকের মাঝখানে ঝুলে থাকে চরিত্রটি।
আরেকটি বিষয় চোখে পড়ে— ভর্তি কোচিংকে এখানে ইতিবাচকভাবে দেখানো হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ভয়ঙ্কর এক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। শিক্ষা এখানে মুক্তির পথ নয় বরং আরেক ধরনের চাপের যন্ত্র। তবে অভিনয়ের জায়গায়—শহরের চরিত্ররা শহরের মতোই হয়েছে, স্বাভাবিক। কিন্তু চা-শ্রমিক চরিত্রগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী। এমনকি বলা যায়— ওরাই পুরো সিনেমাটাকে টেনে সামনে নিয়ে গেছে।
নমস্কার দিদি— আমি রবিন চাঁদ মুর্মু— এই কথার মধ্য দিয়ে আমার চোখ অভিনেতা হিসাবে তাকে প্রথম আবিষ্কার করে। সাফা কবিরকে আলো দিয়েছে রবিন চাঁদ মুর্মু। সাফা কবিরের অভিনয় ভালো হয়েছে, তবে তার ভালোকে সামনের দিকে প্রাগ্রসর করেছে রবিন চাঁদ মুর্মু যার ভাষা থ্রোয়িং এবং অভিনয়ের মধ্যে ফারাক খুবই কম যা তাকে অনন্য অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে গেছে। জন্মের পর থেকে চা বাগানের রবিন দা গোফ রেখেছে। আর কাঠালগাছটা সেই উচু টিলায় রয়ে গেছে। তাই গোফে তেল দিয়েও লাভ হচ্ছে না— রবিনদা রবিনদা-ই থেকে গেলো— গরীবের কাছে স্বপ্ন হলো চিড়িয়াখানার বাঘের মতো, যেটা বাইরে থেকে দেখতে সুন্দর লাগে, কিন্তু ভেতরে যাবার আর সাহস হয় না।
নন্দিনী চরিত্রে সারাহ জেবীন অদিতি ছিলেন পুরো গল্পের প্রাণ। তার অভিনয়ে এতটা স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল যে মনে হয়েছে সে অভিনয় করছেন না বরং বেঁচে আছে সেই চরিত্রের ভেতর। এর আগে তাকে বোহেমিয়ান ঘোড়া-তে দেখা গেলেও “চা গরম”-এ সে যেন নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
গল্প ও চিত্রনাট্যে সাইফুল্লাহ রিয়াদ অসাধারণ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। সংলাপগুলো যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি কমিক রিলিফগুলোও এসেছে খুব স্বাভাবিকভাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা— শেষটা গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে একটি আলাদা স্বাদ দিয়েছে।
চা বাগানের শ্রমিকদের জীবন যেখানে দিনের পর দিন পরিশ্রমের পরও মজুরি থাকে মাত্র ১৮০-১৮৫ টাকা— এই নির্মম বাস্তবতাকে চলচ্চিত্রটি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছে। আমরা যারা চা বাগানে ঘুরতে যাই, ছবি তুলি, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করি— তাদের জীবনের এই দিকটি প্রায়ই চোখ এড়িয়ে যায়। “চা গরম” সেই অদেখা জীবনকেই সামনে নিয়ে আসে।
লোকেশন, লাইট, ক্যামেরা, কালার গ্রেডিং— সবকিছু মিলিয়ে ভিজ্যুয়াল দিক থেকেও চা গরম সিনেমাটি চোখের জন্য এক ধরনের শান্তি। সিলেটের সবুজকে যেভাবে ফ্রেমবন্দী করা হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। স্কিনে কালারটোন কোনো কোনো জায়গায় মার খেয়েছে— তাড়াহুড়ো করার কারনে এমনটা হয়ে থাকে তবে নন্দিনির কালারটোন একেবারে পারফেক্ট— চাকন্যা নন্দিনি। কস্টিউম ঠিক আছে তার।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটা কথা বলি— চা-বাগানের শীতের সকাল এক ধরনের জাগরণ। কুয়াশার শাড়ি ধীরে ধীরে খুলে নেয় সূর্য, আর সেই মুহূর্তে চোখে একধরনের ঝাঁকুনি লাগে— যেন হাজার বছরের ঝিমুনি এক নিমিষে কেটে যায়— মন হঠাৎ করেই হয়ে ওঠে অদ্ভুত চাঙা, ফুরফুরে। কিন্তু চা গরম-এ সেই স্পর্শটা পাইনি। চা-বাগানের বৃষ্টিও আলাদা এক ভাষা— সে বৃষ্টি থামতে চায় না, মনে হয় যেন চা-শ্রমিকের কান্না, ঘাম আর রক্তেরই আরেক নাম অথবা এক অনিবার্য সর্বনাশের প্রতিধ্বনি। এই বৃষ্টির সৌন্দর্য, এই বেদনার গভীরতা— সিনেমার প্রবাহে সেভাবে উঠে আসেনি।
পঞ্চগড়ে গিয়ে কোনো এক শীতে দেখেছিলাম একটি চাগাছ— চাগাছটি আম গাছের মতো বড়। চা গরম সিনেমা দেখে জানতে পারি, চাগাছ বটগাছের মতো বড় হতে পারে কিন্তু তাকে বড় হতে দেয়া হয় না। চাগাছকে খেয়ে বেচে থাকে টাকাওয়ালার স্বপ্ন। চাগাছের মতোই চাবাগানের শ্রমিক— তাদের শ্রম খেয়ে বেচে থাকে টাকাওয়ালার পেট। শ্রমিকদের ঘাম আর রক্তে টিকে থাকে, বেচে থাকে সভ্যতা অথচ তারা থাকে অন্ধকারের ভেতর আরও এক অন্ধকারে। রবিনদা শ্রমিকদের লিডার টাইপের তবে লিডার নয় ঠিক। চা গরমে তার হাটার স্টাইল দুটি— আস্তে আস্তে টেনে টেনে এবং দ্রুত। দুর্দান্ত অভিনয়। তার কথা বলার স্টাইল দুটি— আস্তে আস্তে টেনে টেনে এবং দ্রুত। দুর্দান্ত অভিনয়। নন্দিনি একেবারে মাটির মানুষ এবং পুরো স্কিনে তাকে মাটিঘেষা স্বপ্নপুরির মতো লাগছে। নন্দিনীর বাড়িটিও কিন্তু মাটির। দুদিন পরে মেয়েটার বিয়ে। তারপরও তার মন যেনো স্বপ্নবাড়ি। তার স্বপ্নবাড়ি যখন বাস্তবতার মুখ দেখে ঠিক তখনই সিনেমায় ড্রামাটিক প্রবাহ আসে যা দর্শকের মনে করুন রসের প্রবাহ আনে যা বীররসের আরেক নাম।
অনেক সীমাবদ্ধতা থাকার পরও চা গরম কেবল একটি গল্প নয়— এটি একটি জীবন ধারার গল্প। এখানে নায়ক-নায়িকা নয় বরং মানুষের বেঁচে থাকা, স্বপ্ন দেখা আর সংগ্রামমুখর ইমেজই চরিত্র হয়ে উঠেছে।