পাতালের পাঁচটি নদীর মধ্যে একটি লিথি— বিস্মৃতির নদী। বলা হয়, মৃতরা পূর্বজন্মের স্মৃতি ভুলে যাওয়ার জন্য এই নদীর জল পান করে। দার্শনিকদের মতে, পুনর্জন্মের প্রাক্কালেও আত্মারা লিথির জল স্পর্শ করে, যাতে পাতাল জীবনের স্মৃতি তাদের আর তাড়া না করে।
অতীত ভুলে যাওয়ার আপাতত কোনো প্রয়োজন নেই— ভুলে যাওয়া দরকার কেবল শরীরের ক্লান্তি। অথচ এমন কোনো নদী নেই যার জল পান করলে শরীরের অবসাদ মুছে যাবে। তাই ভেবেছিলাম— কফিই বোধহয় এই সময়ের একমাত্র লিথি। কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের কাছে রুপি নেই; ডলারও নেয় না দোকান। শেষমেশ কার্ডের আশ্রয় নিতে হলো। আমরা তিনজন— আমি, হাবিব, আর এক বাংলাদেশি তরুণ— তিন শট কফি নিলাম। ছেলেটি বেলজিয়াম যাবে। এস্প্রেসোর তীব্রতায় শরীর ধীরে ধীরে জেগে উঠল— যেন ভেতরে জমে থাকা ক্লান্তির ওপর কেউ হালকা রোদ ঢেলে দিল।
চাঙা শরীর নিয়ে শুরু হলো দিল্লি এয়ারপোর্ট ঘোরা।
ঘুরতে ঘুরতে ঢুকে পড়লাম এক ঘড়ির দোকানে। চকচকে হাসি নিয়ে এক তরুণী আমাদের স্বাগত জানাল। একটি ঘড়ির দাম— চার লক্ষ টাকা। মুহূর্তেই ঘুমঘুম ভাব উড়ে গেল— বিস্ময়ের ভেতর দাঁড়িয়ে ভাবলাম— মানুষ কেন এত টাকা দিয়ে ঘড়ি কেনে? মেয়েটি জানাল— কিছু ঘড়ির দাম নাকি কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যায়। মাথার ভেতর হঠাৎ এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল— কোটি মানুষ যেখানে না খেয়ে থাকে, চিকিৎসার বাইরে পড়ে থাকে, সেখানে কারা এই কোটি টাকার ঘড়ির ক্রেতা? অদ্ভুতভাবে মনে পড়ে গেল দুটি পংক্তি—
প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস
তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।
মনে হলো, আমরা সবাই যেন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় নেমেছি— একে অপরের সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিচ্ছি পৃথিবীকে। যারা জিতে যাবে, তারা নিজেদের বীর ভাববে। অথচ বীরত্বের আসল অর্থ তো নিজে জেতা নয়— সবাইকে জিতিয়ে দেওয়া।
এয়ারপোর্টের কাপড়ের দোকানগুলো ঘুরে দেখলাম— দাম মোটামুটি বাংলাদেশের মতোই, আনন্দময় বলা যায়। তারপর উঠে গেলাম দোতলায়, স্পা সেন্টারে। দাম শুনে আর ভেতরে ঢোকা হলো না। হাঁটতে হাঁটতে ঝলমলে আলোয় ডুবে যাচ্ছিলাম। হঠাৎই চোখে পড়ল এক ধরনের শোবার জায়গা— ঘরের বিছানা নয়, তবুও শরীর রাখলেই ঘুম এসে যায়। অদ্ভুত এক টানে শুয়ে পড়লাম। তিন ঘণ্টা ঘুম। চোখ খুলে দেখি— দিন খুলে গ্যাছে, রাত চলে গ্যাছে।
ফ্রেশ হয়ে আমি আর হাবিব বিমানের দিকে হাঁটা দিলাম। দিল্লি এয়ারপোর্টের ফ্রেশ হওয়ার জায়গাগুলো আধুনিক, প্রয়োজনমতো সবই আছে।
বিমানে উঠে জানালার পাশে বসলাম। হাবিবকেও বললাম আরেকটি জানালার সিট নিতে— সে নিল। আমার পাশের সিট দুটি তখনও ফাঁকা। উড়াল দেওয়ার কিছুক্ষণ আগে এক মেয়ে এসে বসল পাশে।
হ্যালো, আই অ্যাম আয়কি।
ইয়েস, আই অ্যাম রেজা।
এরপর শুরু হলো এক দীর্ঘ আড্ডা— সময়ের হিসাব ভুলে যাওয়া আড্ডা। কখন বিমান উড়ল, কখন মাটিতে নামল— আমাদের কারোরই খেয়াল নেই। নিয়মকানুনকে পাশে সরিয়ে আমরা যেন আকাশের ভেতরেই বানিয়ে ফেলেছিলাম এক ছোট্ট আড্ডাঘর।
আয়কি— অদ্ভুত প্রাণবন্ত এক মানুষ। জাইকাতে কাজ করে। বাড়ি জাপানে। কাজের সূত্রে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোই তার জীবন। তার কাছ থেকেই জানলাম, জাপানে বিয়েগুলো বেশিরভাগই ভালোবাসার, নির্ধারিত নয়। তার ব্যবহার ছিল অমায়িক, স্বতঃস্ফূর্ত।বাংলাদেশ সম্পর্কে তার জানাশোনা দেখে অবাক হতে হয়। কথার ফাঁকে যখন জানতে চাইলাম— তার জীবনে ভালোবাসা আছে কি না, সে হেসে বলল, “তোমার মতো কাউকে পেলে হতে পারে।”






তার দুষ্টুমিভরা ভাষা যেমন সুন্দর, তেমনি তার অপেক্ষার ভঙ্গিও।
ইমিগ্রেশনে সে খুব দ্রুতই পার হয়ে গেল। আমাদের সময় লাগল বেশ খানিকটা। সবকিছু শেষ করে বেরিয়ে এসে দেখি— সে অপেক্ষা করছে। তার সেই অপেক্ষায় রোদ ছিল না, ছিল নরম ছায়ার স্পর্শ— এক ধরনের নিঃশব্দ উষ্ণতা।
সেই মুহূর্তে হঠাৎ মনে পড়ে গেল লিথির কথা— বিস্মৃতির নদী। মনে হলো, আমরা দুজন হয়তো সেই অদৃশ্য নদীর জল স্পর্শ করেছি— তাই ভুলে গেছি আমাদের আলাদা আলাদা অতীতযাত্রা— পুরোনো প্রেম যেন নতুন রূপে ফিরে আসে— প্রতিবার, নতুন করে। সব নতুনকে গ্রহণ করার ক্ষমতা দক্ষতা যোগ্যতা আমাদের হয়তো থাকে না, হয়তো থাকে।
বিমানে ওঠার আগে আরেকটি ছোট্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা জমা হয়ে রইল আমাদের ঝুলিতে। ফ্রেশ হয়ে আমরা নাস্তার জন্য ঢুকে পড়লাম এয়ারপোর্টের এক সুসজ্জিত রেস্টুরেন্টে। জায়গাটিতে ছিল এক অদ্ভুত মাধুর্য— আধুনিকতার ভেতরেও ট্র্যাডিশন আর কালচারের সূক্ষ্ম মিশেল। যেন দেয়াল, আলো আর পরিবেশ— সবকিছু মিলে এক ধরনের নীরব গল্প বলছিল।
নাস্তায় নিলাম দোসা— আমার প্রিয় খাবারগুলোর একটি। এর আগে কলকাতায় দোসা খেয়েছিলাম, কিন্তু তেমন কোনো আনন্দ পাইনি। অথচ এখানে— গরম গরম, হালকা ঝাল, মশলার নিখুঁত ভারসাম্যে— প্রতিটি কামড়ে যেন নতুন করে দোসাকে আবিষ্কার করলাম। খাবার কখনো কখনো শুধু স্বাদ নয়, জায়গা আর মুহূর্তের সঙ্গেও জড়িয়ে থাকে— সেদিন সেটাই টের পেলাম।
বিমানের খাবারও ছিল বেশ ভালো। Air India-এর সার্ভিস বিশেষ করে খাবারের ক্ষেত্রে সত্যিই প্রশংসনীয়। আমি আর আয়কি গল্প করতে করতেই খাবার উপভোগ করছিলাম— কথার ফাঁকে ফাঁকে হাসি, আর সেই হাসির ফাঁকে খাবারের স্বাদ যেন আরও গভীর হয়ে উঠছিল।
হঠাৎ মনে হলো— জীবন তো আসলে উপভোগের জন্যই। অভিযোগ করে লাভ কী? আর অভিযোগই বা করব কার কাছে?










Leave a Reply