You are here

ভালো ফসল তুলতে পারেন ঘরে

ধরুন, আপনাকে আপনার শিক্ষক বকা দিলেন— আই মিন, আপনার সংশোধনের জন্য উচ্চস্বরে কথা বললেন। তখন আপনার মন বিষণ্ন হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু না— এটা আসলে অস্বাভাবিক। শিক্ষক উচ্চস্বরে কথা বলুক, হেসে কথা বলুক, ক্রাইং মোডে কথা বলুক— অর্থাৎ যেভাবেই আপনাকে কিছু বলুক না কেন, সেটা আসলে খুব একটা ম্যাটার করে না। ম্যাটার করে শিক্ষক কী বলছেন। শিক্ষকের কথা শুনে আপনি সংশোধিত হবেন— এটাই একজন যোগ্য শিক্ষকের যোগ্যতম চাওয়া।

পথে যেতে যেতে একদিন একজন সাধু টাইপের মানুষের সঙ্গে আমার দেখা হলো। খুব নির্জন জায়গায়। তিনি অঝোরে কাঁদছেন। আমি বললাম — আমি কি কোনোভাবে আপনাকে কোনো সহযোগিতা করতে পারি? লোকটি চুপ। কোনো কথা বলছেন না। কেবল কাঁদছেন।

আমি তার জন্য এক লিটার পানি কিনে নিয়ে আসি—আশেপাশে কোনো দোকান ছিল না। প্রায় এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তার জন্য পানি নিয়ে আসি। পানির বোতল তার সামনে রাখি। তিনি একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না।
আমি তার পাশে বসি, তবে সামাজিক দূরত্ব মেইনটেইন করে।

সকাল গেল। দুপুর গেল। তিনি কাঁদছেন। মাঝেমধ্যে কান্না থামিয়ে চুপ করে বসে থাকেন— যেন কান্নার মধ্যেই নীরবতা। আবার কাঁদেন। প্রায় বিকেলের দিকে তিনি পানি পান করলেন এবং আমার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন।

জানেন, আমার গুরুর সঙ্গে আমি আছি কুড়ি বছর ধরে। অথচ আজও আমার মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আজও আমি আত্মার ডাক শুনতে পাই না। আমি একটা ননসেন্স!

আমি বললাম, — জি, আপনি একটা ননসেন্স!
তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, — এই কথা কেন বললেন?

দেখুন, আপনাদের গুরু-শিষ্যের জগৎ আমি খুব একটা বুঝি না। তবে ননসেন্স হওয়াও একটা সাধনা। ননসেন্স হতে পারা একটা তপস্যা। ননসেন্স বোধে থাকা অনেক বড় মাপের একটা উপাসনা। আপনি যে নিজেকে ননসেন্স বলছেন— এটা ননসেন্স মানসিকতা নয়; এটা সেন্সে থাকার জন্য এক ধরনের যুদ্ধ-যুদ্ধ প্রচেষ্টা।

আমার কথা শুনে লোকটি আমার পায়ে লুটিয়ে পড়লেন।
আমি তাকে অত্যন্ত ভদ্রভাবে বললাম— দেখুন, আমার কাছে আপনার সমর্পিত হওয়ার কিছুই নেই। আপনি সমর্পিত হোন আপনার আত্মার কাছে। চরণ ধরে বর্জনের ক্ষমতা আসে না— বর্জনের অর্জন আসে আচরণ ধরে।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন— বর্জনের অর্জন কী?

বর্জন করার ফলে যে অর্জন আসে, সেটাই বর্জনের অর্জন। একটা বীজ মাটিতে রোপণ করুন। দেখবেন বীজটি পচে যাবে। সেই পচে যাওয়া বীজের মধ্য থেকেই একদিন একটি কচি সবুজ বের হয়ে আসে। এই কচি সবুজটাই বর্জনের অর্জন, আর বীজটাই হলো বর্জন।

— গেলাম, ভালো থাকবেন।

লোকটি আমাকে বিদায় দিতে চায়নি। কিন্তু বিদায় তো আমাকে নিতেই হবে। যেতে হবে আরও দূরে— অন্য কোনো নির্জন পুরে, যেখানে কেউ বসে বসে কষ্টের চাষ করছেন। তার সেই চাষাবাদে সহযোগিতা করতে হবে— যাতে তিনি, বা সে, বা তারা, বা আপনি— ভালো ফসল তুলতে পারেন ঘরে।

Leave a Reply

Top